Wednesday, April 25, 2018

সুন্দরবনঃ পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সম্পর্কে কিছু তথ্য - ০৭

সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার : রয়েল বেঙ্গল টাইগার হলো সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। বর্তমানে বাংলাদেশের মধ্যে সুন্দরবনই হলো বাঘের শেষ আবাসস্থল। এই রয়েল বেঙ্গল টাইগার আমাদের জাতীয় পশু। এর গায়ে লালচে বর্নের উপর কালো ডোরাকাটা দাগ থাকে। এছাড়া এই বাঘের রয়েছে রাজকীয় চলন ও ক্ষিপ্রগতি। সুন্দরবনের প্রায় সব জায়গাতে এর পদচারনা লক্ষ করা যায়। কখনো সে গভীর অরণ্যে লুকিয়ে থাকে বা নদী-খালের পাড়ে হেতাল বা গোলপাতা গাছের নীচে আয়েশী ভঙ্গিমায় বিশ্রাম নেয় অথবা ঘাসের উপর শুয়ে থাকে। কখনও বা সে সাঁতার কেটে খাল বা নদী পারাপার হয় বা সমুদ্র সৈকতের পাড় দিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিমায় হেঁটে চলে। বেঙ্গল টাইগারের এই অবাধ বিচরণের কারণে অবৈধ শিকারীরা বনের সম্পদ নষ্ট করতে ভয় পায়। তাই বাঘকে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক রক্ষকও বলা হয়।
বিভিন্ন জরিপের ফলাফল থেকে জানা যায় যে, সুন্দরবনে প্রায় ৩৫০-৪০০ টি বাঘ রয়েছে। যা কিনা বিশ্বের যে কোন একক বনের সর্বোচ্চ সংখ্যক বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল। এই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের রাজকীয় চলন, ক্ষিপ্রগতি এবং তার বাহ্যিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য দেশ-বিদেশ হতে প্রচুর সংখ্যক পর্যটক প্রতি বছর সুন্দরবন ভ্রমন করে থাকে। একটা রয়েল বেঙ্গল টাইগারে দৈর্ঘ্য লেজ হতে মাথা পর্যন্ত ৯-১০ ফুট হয়। মহিলা বাঘ লম্বায় গড়ে সাড়ে আট ফুট। লেজের দৈর্ঘ্য সাধারণত তিন ফুট হয়। তবে ১৮ ফুট লম্বা পর্যন্ত বাঘ সুন্দরবনে পাওয়া গেছে। বাঘের সামনের পা দু’ টো মোটা, অনেকটা থামের মত। বাঘের উচ্চতা গড়ে ৪ ফুট। বাঘের ওজন ৪-৬ মন হয়। বাঘিনীর ওজন ৩ থেকে ৫ মন হয়। বাঘকে সুন্দরবনের রাজা বলে গন্য করা হয়।

বাঘের সৌন্দর্য, চেহারা মাধুর্য, শক্তি, নির্দয়তা সুপার প্রাকুতিক গুনাবলীর জন্য মানুষ বাঘকে মান্য করে, ভয় পায় এবং সম্মান করে। বাঘের থাবাগুলো এমনভাবে সৃষ্ট যাতে দুরন্ত শিকারকে আঘাত ও ধরতে পারে। কেনিন দাত এমনভাবে সাজানো যাতে শিকারকে কামড়াতে ও মারতে মারে।বাঘের শক্তিশালী চোয়াল আছে যা ক্ষমতাশালী মাংসপিন্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, পায়ের তালু বেশ নরম। ফলে নিঃশব্দে দৌড়াতে পারে। বাঘের শব্দ শোনার ক্ষমতা, কোন কিছু দেখা এবং কোন প্রাণীর গন্ধ বুঝার ক্ষমতা খুবই উচ্চ ও প্রখর। বাঘ শব্দ শুনলে বা গন্ধ পেলে কোন বন্য প্রাণীর অবস্থান বা বন্য প্রাণী কি করছে তা বুঝতে পারে। বাঘ নিজকে একটি ছোট ঝোপ ঝাড়ে বা গাছের পেছনে বেশ ভালভাবে আড়াল করে রাখতে পারে। তা’ ছাড়া কোন শব্দ ছাড়া শিকার ধরার জন্য একনিষ্ঠভাবে অবস্থান করে। অতি সন্নিকটে হরিণ, বানর থাকলেও অনেক সময় এরা বাঘের উপস্থিতি বুঝতে পারে না। নিজের সুবিধা মত দুরত্বে এক লাফে হরিণ, বানর, ইত্যাদি ঘাড়ে থাবা দিয়ে মেরে ফেলে। তারপর আস্তে আস্তে ভক্ষন করে। হরিণ, বানর, শুকর ইত্যাদি তৃনভোজী প্রাণী বাঘের হাত হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য নুতন পদ্ধতি বের করলেও বাঘও শিকার ধরার জন্য সেভাবে নুতন পদ্ধতি বের করে। যার ফলে বাঘ মাংসভোজী প্রাণীর মধ্যে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

একটি বাঘ একটি বন এলাকায় বাস করে। বাঘ একা একা নির্জনে থাকতে ভালবাসে। বাঘ কখনো দল বেধে চলাফেরা করে না। পুরুষ বাঘের বসবাসের এলাকা মহিলা বাঘের চেয়ে বড়। বাঘিনীর বসবাসের এলাকার পরিধি নির্ভর করে বাঘের বাচ্চার বয়স এবং বাচ্চার চলাফেরার ক্ষমতার উপর। কয়েকটি বাঘিনীর আবাসিক এলাকা নিয়ে একটি বাঘের বিচরণ ভুমি বা আবাসিক এলাকা গঠিত হতে পারে। বাঘ তার জন্য পছন্দমত বনভুমি ঠিক করে নেয়। খাদ্যাভাব বা মানুষ দ্বারা বিরক্ত না হলে নিজের বনাঞ্চল ত্যাগ করে না। একটি বাঘের বন এলাকায় অন্য বাঘ আসলে মারামারি লেগে যায়। তাই সবাই সবার আবাসিক এলাকা সংরক্ষন করে রাখে। প্রজনন ঋতুতে বাঘ ও বাঘিনী একত্রে চলাফেরা করে। শরৎকাল বাঘের প্রজনন সময়। প্রজনন ঋতু শেষ হলে বাঘ ও বাঘিনী আলাদা হয়ে যার যার আবাস এলাকায় চলে যায়।

প্রজনন ঋতুতে দু’টো বাঘ একটি বাঘিনীর কাছে আসলে দু, টো বাঘের মধ্যে মহাযুদ্ধ বেঁধে যায়। অনেক সময় বাঘিনী এ দৃশ্য পছন্দ করে না বলে অতি আস্তে আস্তে সে অন্য কোথাও চলে যায়। বাঘ পানিতে সাতার কাটতে পারে। আবার মাঝে মধ্যে গাছেও চড়ে। বাঘ ও বাঘিনী ২.৫ বছর বয়সে প্রজননক্ষম হয়। এ সময় বাঘের ডাকে সুন্দরবনের নির্জনতা কয়েক দিনের জন্য হারিয়ে যায়। বাঘ খুব উচ্চ স্বরে ডাকতে থাকে। ডাক শুনে মহিলা বাঘ পুরুষ বাঘের কাছে যায়। ৫-৭ দিন একত্রিত হওয়ার পর বাঘিনী গর্ভবতী হয়। বাঘিনীর গর্ভকাল সাধারণতঃ তিন মাস হয়। বাচ্চা প্রসবের দিন ঘনিয়ে আসলে বাঘিনী বাঘকে ছেড়ে নিরিবিলি আশ্রয়ে চলে যায়। আর বাঘ বাঘিনীর প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে। প্রজননের সময় বাঘ কোন মতেই কারও উপস্থিতি সহ্য করে না এবং কারো বিরক্তি পছন্দ করে না। তখন তারা বেশী হিংস্র হয়ে উঠে। বাঘিনী এক সাথে ২ – ৪ টি বাচ্চা প্রসব করে। বাচ্চা প্রসব করার পর বাঘিনী প্রথম দিকে বাঁচ্চাকে স্তন পান করায়। ধীরে ধীরে যখন বাঘের বাচ্চা বড় হতে শুর করে তখন তাকে শিকার করা শিখানো হয়। বাঁচ্চা বড় না হওয়া পর্যন্ত বাঘিনী বাঁচ্চাকে সব সময়ই বাঘের আড়াল করে রাখে। কারণ বাঘ বাঘের বাঁচ্চা খেয়ে ফেলে।

বাঘের বয়স যখন ২.৫ বছর হয় তখন তাদের দুধের দাত পড়ে যায় এবং মায়ের নিকট হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী জীবনযাপন শুরু করে। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার প্রায় ২০ বছর পর্যন্ত বাঁচে। ্একটি বাঘিনী তার জীবদ্দশায় গড়ে ৬ বার বাচ্চা প্রসব করে। বাঘিনী ২ বছর পর পর বাচ্চা দেয়। হরিণ ও শুকর খেতে বাঘ বেশী পছন্দ করে। অনেক সময় বাঘকে কাকড়া ও মাছ খেতে দেখা যায়। যখন বাঘ বৃদ্ধ হয়ে যায় এবং শিকার করতে অসুবিধা হয় তখন সুন্দরবনের অভ্যন্তরে ছোট ছোট খালের মধ্যে দাখিয়ে কাকড়া ও মাছ ধরে খায়। অনেক সময় সুযোগ পেলে বাঘ জনপদে ঢুকে মানুষ , গরু, ছাগল, মহিষ শিকার করে খায়। রয়েল বেঙ্গল টাইগার শিকার করে প্রথমে রক্ত খায়। তারপর একটি নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে মাংস খেতে শুরু করে। পেট ভরে গেলে আহার ঢেকে রেখে কাছেই ঘুরাফেরা করে। আবার ক্ষুদা লাগলে খায়। এভারে খাবার শেষ হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে। বাঘের পেট ভর্তি থাকলে কাছে হরিণ, শুকর থাকলেও শিকারের জন্য বাঘ ব্যস্ত হয় না।

বাঘ প্রতিদিন ৬-১০ কেজি মাংস খেতে পারে। বাঘ প্রতি সপ্তাহে গড়ে একটি হরিণ খায়। সুন্দরবনের বাঘ সাধারণত সন্ধ্যা হতে ভোর হওয়ার মধ্যে শিকার করে। দিনের বেলায় গরমে বাঘ সাধারণত পানির ধারে বেশী বিশ্রাম নেয়। রয়েল বেঙ্গল টাইগার খুবই নির্দয়। সময় ও সুযোগ পেলে এরা মানুষকে আক্রমন করে রক্ত ও মাংস খায়। অনেক মানুষকে মারতে না পারলেও আহত করেম ছোবল দিয়ে এক গুচ্ছ মাংস নিয়ে যায় বা চুষে রক্ত খায়। প্রতি বছর সুন্দরবনে বাওয়ালী, জেলে, মৌয়ালী এবং অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে বনজ দ্রব্য পাচারকারী লোকজন বাঘের নির্মম আঘাতে প্রাণ হারায়। এতে গড়ে প্রতি বছর সুন্দরবনে বাঘ কর্তৃক অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ৭০-৮০ জন লোক মারা যায়।

সুন্দরবনে যেমনি বাঘ কর্তৃক মানুষ মারা যায় তেমনি কোন কোন সময় মানুষ কর্তৃক বাঘও মারা যায়। বাঘের চামড়া, কংকাল, মাথার খুলি প্রভুতি সংগ্রহের লোভে অনেক সময় পাচারকারীরা অবৈধভাবে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার নিধন করে থাকে। একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার এর চামড়া ও কংকাল দেশের ভিতরে এক লক্ষ টাকা এবং দেশের বাইরে বিক্রি করলে ৪-৫ লক্ষ টাকা পাচারকারীরা বিক্রয় করে। বাঘের জিব্বা সাংঘাতিক ধারালো। মনে হয় ক্ষুরের মত। সুন্দরবনে অনেক সময় বাঘে-মহিষে লড়াই হয়। সব সময়ই যে বাঘ মহিষকে কব্জা করতে পারে তা নয়।
.
-চলবে

No comments:

Post a Comment

Follow Us @VisitSundaebon