Sunday, April 29, 2018

সুন্দরবনের নল খাগড়া ঘাস ঃ নল খাগড়া সুন্দরবনের এক প্রকারের ঘাস। নদী ও খালের পাড়ে নল খাগড়া খুব ঘন ভাবে জন্মে। নতুন জেগে উঠা চরেও এ ঘাস প্রচুর পরিমানে জন্মে। গরাণ বনে নল খাগড়া জন্মে। তবে বাইন বনে খুব সামান্য দেখা যায়। নল খাগড়া অক্টোবর হতে নভেম্বর মাস পর্যন্ত বাওয়ালীরা সুন্দরবন হতে সংগ্রহ করে। নল খাগড়া দিয়ে ঝুড়ি, সাজি, এবং ধামা তৈরী করা হয়। একটি ডুলা তৈরী করতে প্রায় ২০ কেজি নল খাগড়া লাগে। সুন্দরবন হতে প্রচুর পরিমানে নল খাগড়া বাওয়ালীরা আহরণ করে। কয়রা, পাইকগাছা, আশাশুনিতে নল খাগড়া দিয়ে ঝুড়ি, সাজি ইত্যাদি তৈরীর জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। নল খাগড়া শুকাতে ৪-৫ দিন এবং প্রক্রিয়াজাত করতে ৭-১০ দিন সময় লাগে। নল খাগড়া দিয়ে একটা ডুলা তৈরী করতে ৪ দিন লাগবে।

সুন্দরবনের উলু ঘাস ঃ উলু ঘাসকে স্থানীয় লোকেরা খেড় বলে। সুন্দরবন হতে প্রাপ্ত উলু ঘাসকে বাধাই খেড় বলে। এ বাধাই খের খুব মজবুত ও টেকসই। সুন্দরবনে উলু ঘাস পাওয়া যায় শুস্ক স্থানে এবং উচু স্থানে। উলু ঘাস যেখানে জন্মে সে স্থান জোয়ারের পানিতে ডুবে না। সুন্দরবনের যেখানে কোন সাকসেশন নেই সেখানে উলু ঘাস জন্মে। উলু ঘাস সাধারণতঃ র্২ – র্৩ লম্ব্ াহয়। শীতকালে উলু ঘাস সংগ্রহ করা হয়। এ সময় বাওয়ালীদের উলু ঘাসের পারমিট দেয়া হয়। ৩-৫ জন বাওয়ালী ১ মাসে এক নৌকা উলু ঘাস সংগ্রহ করে। রান্না ঘর, গরু ঘর, পানের বরজ, বাস গৃহ প্রভৃতির চাল তৈরীতে উলু ঘাস ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। পানের বরজে উলু ঘাস বেশি করে ব্যবহৃত হয়। কারন এর টেকসই বেশি। এছাড়া সুন্দরবনের কচিখালী, কটকা ও নীলকমল বন্যপ্রাণী এলাকায় প্রচুর ছন উৎপন্ন হয়।

সুন্দরবনের হেতাল গাছ ঃ হেতাল সুন্দরবনের একটি অকাষ্ট বনজ সম্পদ। হেতালের চাহিদা রয়েছে স্থানীয় লোকজনের কাছে। বাওয়ালীরা সারা বছর সুন্দরবন হতে হেতাল আহরণ করে থাকে। হেতালকে আবার কখনো সুন্দরবনের আগাছাও বলা হয়। হেতাল সাধারণত নদী বা খালের পাড়ে উচু জায়গায় জন্মে। সুন্দরবনের সর্বত্র হেতাল জন্মে। কোন কোন জায়গায় বিশাল এলাকা জুড়ে হেতাল বনের বেষ্টনী দেখা যায়। হেতালগুলো খেজুর গাছের মত দেখায় এবং ফলগুলোও দেখতে খেজুর ফলের মত। তবে আকারে খেজুর গাছ ও ফল হতে ছোট। হেতাল বন কণ্টকাকীর্ন। হেতাল বনে বাঘ থাকার সম্ভাবনা বেশী। হেতালের পারমিট সারা বছর দেয়া হয়। তবে প্রতি নৌকায় ২০০ মনের উর্দ্ধে কোন পারমিট দেয়া হয় না। ২০০ মন হেতাল ১৪ দিনে সংগ্রহ করতে ৩-৪ জন বাওয়ালী প্রয়োজন হয়। ১৪ দিনের মধ্যে ৪ দিন বনে যাওয়া আসা এবং ১০ দিন প্রকৃত পক্ষে হেতাল কাটায় অতিবাহিত হয়। প্রতি বছর হেতাল সংগ্রহের জন্য ৯০০-১০০০ পারমিট দেয়া হয়। বছরে গড়ে সুন্দরবন হতে ৭ হাজার মেট্রিক টন হেতাল সংগ্রহ করা হয়। র্৫ দৈর্ঘের হেতাল গাছ কাটা হয়। র্৬, র্৭, র্৮, র্৯ বিভিন্ন দৈর্ঘের হেতাল পাওয়া যায়। হেতাল বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। ঘরের রোয়া, আদল ও পাইর হিসেবে হেতাল ব্যবহৃত হয়। সাধারণত গ্রামীণ লোকেরা গরু ঘর, রান্না ঘর, চিংড়ি ঘেরের ঘর তৈরীতে হেতাল ব্যবহার করে। ১র্২ – ১র্৫ লম্বা হেতাল ঘরের খুটি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। হেতাল এর ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। বরিশাল ও খুলনা বিভাগে হেতাল প্রচুর পরিমানে বিক্রয় হয়।

সুন্দরবনের ঘুর্নিঝড়, জলোচ্ছাস ও সিডর ঃ ঘুর্নিঝড় ও জলোচ্ছাসের আঘাতে প্রতিনিয়ত সুন্দরবনের ব্যাপক ক্ষতি হয়। বিগত ১৪০ বছরে সুন্দরবনে কমপক্ষে ৫০ বার ঘুর্নিঝড় ও জলোচ্ছাস হয়। এর ফলে সুন্দরবনের উদ্ভিদরাজি ও বন্যপ্রাণীর প্রভুত ক্ষতি হয়েছে। প্রতি ৩ (তিন) বছর অথবা ৫ (পাঁচ) বছরে একবার সুন্দরবনে ঘুর্নিঝড় হওয়ার প্রবনতা দেখা যায়। এ ব্যাপারে একটি ধারাবাহিক বর্ননা নিম্নে প্রদান করা হলো। ১৫৫৮ খৃষ্টাব্দে সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে সুন্দরবনের উপর এক ভয়ংকর জলোচ্ছাস হয় যা পাঁচ ঘন্টা ব্যাপী স্থায়ী হয়। ১৬৮৮ খৃষ্টাব্দে সুন্দরবনের উপর দিয়ে ভীষণ ঝড় হয়। এতে সুন্দরবনের আশে পাশের প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশী মানুষের মৃত্যু হয়। ১৭০৭ খৃষ্টাব্দে আরও একটি মারাত্বক ঝড়ে সুন্দরবনের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সেই সময় সুন্দরবনের আশে পাশের অনেক মানুষ ঘরবাড়ী ত্যাগ করে উত্তর দিকে পলায়ন করে। ১৭৩৭ খৃষ্টাব্দে সুন্দরবনে একসাথে ঝড় এবং ভৃমিকম্প হয়। তাতে সুন্দরবন ছিন্ন বিছিন্ন হয়ে যায়। সুন্দরবনের বড় বড় গাছ পালার ব্যাপক ক্ষতি হয়। প্লাবনে নদীর পানি ৪০ ফুট পর্যন্ত উঠে বলে ধারণা করা হয়। ১৮৬২ খৃষ্টাব্দের ১০ই মে সুন্দরবন অঞ্চলে প্রবল ঝড় ও ঝটিকা হয়। এই ঝড় যশোর ও খুলনা পর্যন্ত বিতৃর্ণ ছিল। ১৮৬৯ খৃষ্টাব্দের মে মাসে সুন্দরবনের উপর দিয়ে যে ঝড় হয় তাতে সুন্দরবনের যথেষ্ট ক্ষতি হয়। ১৮৯৫ খৃষ্টাব্দে সুন্দরবনের উপর দিয়ে প্রচন্ড ঝড় বয়ে যায়। এই ঝড়ে বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করে। ১৯০৯ খৃষ্টাব্দের ১৭ই অক্টোবর সুন্দরবনের উপর দিয়ে এক মারাত্বক ঝড় বয়ে যায়। এই ঝড়ে বরিশাল ও খুলনা জেলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়। ১৯১৯ খৃষ্টাব্দে ঝড়ে সুন্দরবনের অনেক ক্ষতি হয়। ১৯৬১ খৃষ্টাব্দের ৯ই মে উপকুলীয় অঞ্চলে ঝড়ে উপকুলের অপুরনীয় ক্ষতি হয়। ১৯৬৫ সালের ১১ মে আর একটি সুন্দরবনের আরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। ১৭৩৭ খৃষ্টাব্দের ভুমিকম্পে সুন্দরবনের ভয়াবহ ক্ষতি হয়। ১৭৬২ খৃষ্টাব্দের ২রা এপ্রিল এক ভৃমিকম্পে বার্মা হতে কলিকাতা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এই ভুমিকম্পে সুন্দরবন এক প্রকার ডুবে গিয়েছিল। ১৮১০, ১৮২৯, ১৮৪২, ১৮৯৭, ১৮৫২, ১৮৮২ খৃষ্টাব্দের ভৃমিকম্পে সুন্দরবনের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এছাড়া ১৯৬০ সালের ৯ই অক্টোবর, ১৯৬০ সালের ৩০শে অক্টোবর, ১৯৬১ সালের ৯ই মে, ১৯৯১ সালে ৩০ মে, ১৯৬৩ সালের ২৮ শে মে, ১৯৬৫ সালের ১১ই এপ্রিল, ১৯৬৫ সালের ১১ই মে, ১৯৬৫ সালের ৩১শে মে, ১৯৬৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৬৬ সালের ১লা অক্টোবর, ১৯৬৭ সালের ১১ই অক্টোবর, ১৯৬৭ সালের ২৬ শে অক্টোবর, ১৯৬৮ সালের ১০ই মে, ১৯৬৯ সালে ১০ই এপ্রিল, ১৯৬৯ সালের ১৭ই এপ্রিল, ১৯৭০ সালের ৩রা মে, ১৯৭০ সালের ১০ই মে, ১৯৭০ সালের ২৩শে অক্টোবর, ১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর, ১৯৮৫ সালের মে মাসে, ১৯৮৮ সালের ২৯শে নভেম্বর, ১৯৯১ সালের এপ্রিল মাসে, ১৯৯৫ সালের মে মাসে সুন্দরবনে ব্যাপক জলোচ্ছাস হয়।

বাংলাদেশের উপকুলীয় অঞ্চলে যে ঝড় ও জলোচ্ছাস হয় তা সুন্দরবনেও আঘাত হানে। সুন্দরবন এর পার্শবর্তী খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা জেলার ১৬টি উপজেলার জানমালকে ঝড় ও জলোচ্ছাস থেকে রক্ষা করে আসছে। সুন্দরবন এই অঞ্চলের মাটি, মানুষ ও স্থাপনা সমুহকে রক্ষা করে আসছে। সুন্দরবন বুক আগলে ঝড় ও জলোচ্ছাসের তান্ডবকে সহ্য করছে। সর্বশেষ ২০০৭ সালের ১৫ই নভেম্বর প্রলয়ংকারী ঘুর্নিঝড় সিডরের আঘাতে সুন্দরবনের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সিডরের আঘাতে শরনখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের ১৮টি কম্পার্টমেন্টের ১,১০,০০০ হেক্টর বনভৃমি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। শরণখোলা রেঞ্জের অন্তর্গত সুন্দরবন পুর্ব বন্যপ্রানী অভয়ারন্য মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। সিডরের পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংস্থা সিডরে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শন করে। ইউএনডিপি এর হিসেবে সিডরে সুন্দরবনের ২১% , ইউনেসকো এর হিসেবে ৩০%, এসপারসো এর হিসেবে ১৯% এবং বন বিভাগের রিমস ইউনিটের হিসেবে ২২% এলাকা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।

সুন্দরবনের এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য বাংলাদেশ সরকার সুন্দরবন হতে মাছ ও মধু আহরণ করা ছাড়া অন্য সব সম্পদ আহরণ ২০০৭-০৮ সনের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষনা করে। যাতে এই বন প্রাকৃতিক ভাবেই নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করে পুর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে। সিডরের কারনে সুন্দরবনের পুর্বাংশ ১০ থেকে ১৫ ফুট উচু জলোচ্ছাসে নিমজ্জিত হওয়ায় ঐ অংশের গাছপালার অধিক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। ঘুর্নিঝড় সিডরের আঘাতে নদীর মোহনা এলাকায় বিভিন্ন গাছপালা বিশেষতঃ কেওড়া ও গেওয়া মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এছাড়া সুন্দরী গাছও ভেঙ্গে উপড়িয়ে পড়ে অনেক স্থানেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ঘুর্নিঝড়ের পর কোন কোন এলাকা দেখে মনে হয়েছিল যেন ঐ স্থানের গাছের সমস্ত পাতা আগুনে পুড়ে গেছে। অনেক স্থানেই নদীর তীরবর্তী গোলপাতার ঝাড় উপড়ে যায় এবং স্রোতে ভেসে যায়। স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষন করে বন বিভাগের রিমস ইউনিট সিদ্ধান্তে আসে যে, সিডরের আঘাতে সমগ্র সুন্দরবনের ২.৪৭% এলাকা মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ , ১৫.২৩% এলাকা আংশিকভাবে এবং ৪.৪৭% এলাকা স্মাান্য ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষন বিভাগ, খুলনা এর রিপোট অনুযায়ী সিডরের আঘাতে সুন্দরবনে ৪০টি হরিণ, ১টি বাঘ, বহু বানর, পাখি, সাপ মারা গেছে। এছ্ড়াা সুন্দরবনের অভ্যন্তরে মিষ্টি পানির পুকুরগুলো লোনা পানিতে প্লাবিত হয়ে যায়। এর ফলে খাবার পানির তীব্র সংকটে বন্যপ্রাণীর বেঁচে থাকা দুরহ হয়ে পড়ে। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে কর্মরত বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীগন এবং জেলে-বাওয়ালীগনও তীব্রভাবে খাবার পানির সংকটে পড়েন। সিডরের পরপরই বন বিভাগ অন্যান্য সরকারী সংস্থার সহায়তায় পুকুরের পানি লবনাক্ততা মুক্ত করার ব্যবস্থা করে এ সংকট থেকে উত্তরণ ঘটানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সিডরের আঘাতে সুন্দরবনের রেঞ্জ, ষ্টেশন, টহল ফাঁড়ি ও রেষ্ট হাউসগুলোর বিভিন্ন অবকাঠামো কোন কোন স্থানে সম্পর্ণভাবে কোন কোন স্থানে আংশিকভাবে বিধ্বস্ত হয়। ওয়ারলেস যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত মোট ২০টি সংখ্যায় সুন্দরবনের ধারণা ও সম্পদের বিশালতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সীমাবদ্ধতার কারনে সকল বিষয়ে আলোচনা করা সম্ভব হয় নি। সুন্দরবন বিশাল। এই বিশালতা চোখে না দেখলে ধারণা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের গর্ব এই সুন্দরবন। শুধু বাংলাদেশের গর্ব নয়, এই সুন্দরবন বিশ্বের গর্ব। সুন্দরবনের মত দ্বিতীয়টি আর কোথাও নেই। পরিবেশ সংরক্ষনের স্বার্থে সুন্দরবনকে সংরক্ষন করতে হবে। শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য নয়, ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষনের স্বার্থে সুন্দরবনের সংরক্ষনের বিকল্প কিছু নেই। সুন্দরবন এখনও টিকে আছে, তাই হয়ত আমরা এর প্রয়োজন ও গুরুত্ব বুঝতে পারছি না। যদি এমন কোন পরিস্থিতি হয় সুন্দরবন বাংলাদেশে দক্ষিণ অঞ্চল হতে নিশ্চিন্ন, তখন হয়ত বোঝা যাবে সুন্দরবন বাংলাদেশের জন্য কত প্রয়োজন ছিল।

এই সুন্দরবন নিয়ে ষড়যন্ত্রের শেষ নেই। দেশী বিদেশী সকল ধরনের ষড়যন্ত্রকারীরা বাংলাদেশের সুন্দরবন নিয়ে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এই সকল ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার হতে হবে। বৃহত্তর সুন্দরবনের ষাট শতাংশ বাংলাদেশের অংশ এবং চল্লিশ শতাংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অংশ। পশ্চিমবঙ্গের যে অংশে এ সুন্দরবন সে অংশের সুন্দরবনের অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক খারাপ। পশ্চিমবঙ্গের অংশের সুন্দরবন অনেক আগেই তার সংরক্ষিত চেহারা হারিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন এর অনেক অংশ জবর দখলদারদের কবলে। এই ধরনের চিত্র বাংলাদেশে নেই। গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের সুন্দরবনের কোন অংশ জবর দখল হয় নাই। বাংলাদেশের সুন্দরবন পাকিস্তান আমল হতে সীমিত অর্থ দ্বারা পরিচালিত হতো। জনবলও ছিল প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। তখন সুন্দরবন হতে প্রচুর পরিমানের বনজ দ্রব্য আহরিত হতো। সুন্দরবনে যে সকল কর্মকর্তা কর্মচারী কাজ করতো তারা বন সংরক্ষনের পাশাপাশি বনজদ্রব্য আহরনের সাথে যুক্ত ছিল। বনজদ্রব্য আহরনে বেশ কিছু বাড়তি সুবিধা বন কর্মচারী কর্মকর্তারা পেত। এই সকল সুযোগ সুবিধা পাওয়ায় তারা শত কষ্টের মধ্যে সুন্দরবনে থেকে কাজ করতো। সুন্দরবন সংরক্ষনে ও প্রশাসনিক কাজ-কর্ম চালাতে যে অর্থের প্রয়োজন হতো সে অর্থ সরকারী ভাবে বরাদ্দ না করলেও তেমন কোন সমস্যা হতো না। কর্মচারী কর্মকর্তারা যে সকল সুযোগ সুবিধা পেত তা থেকে বন সংরক্ষনের প্রশাসনিক কাজে প্রয়োজনীয়া অর্থ জোগান দেয়া হতো। এটি এক ধরনের অন্যায়।

বাংলাদেশ হওয়ার পরও এ ধারা অব্যাহত থাকে। এর কারনে সুন্দরবন সংরক্ষন ও উন্নয়নে যে পরিমান অর্থের প্রয়োজন যে পরিমান অর্থের বরাদ্দ ছিল না। বর্তমানে সুন্দরবন হতে বনজদ্রব্য আহরণ কমে গেছে। বাড়তি তেমন কোন সুযোগ সবিধা নেই। সমস্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। সৃতরাং সুন্দরবন সংরক্ষণে বিষয়টি চিন্তা করা অত্যন্ত জরুরী। বনাভ্যন্তরে অবস্থিত যে কোন ক্যাম্পে জনবল প্রেরনের পুর্বেই সেখানে নিম্নবর্নিত কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। যেমনঃ পানিয় জলের জন্য গভীর নলকুপের ব্যবস্থা করা, পর্যাপ্ত আলোর জন্য সৌর শক্তি এবং জেনারেটর এর ব্যবস্থা করা, ক্যাম্প এলাকায় যাতে জোয়ার ভাটার পানি প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় বাধ নির্মাণ করা, বন্য প্রাণীর আক্রমন হতে আত্বরক্ষার জন্য বাধের ওপর অত্যন্ত মজবুত লোহার বেড়া স্থাপন করা ,মিষ্টি পানির পুকুর খনন করা, কর্মকর্তা কর্মচারীদের অবস্থানের জন্য পাকা ইমারত নির্মান করা। বন বিভাগ গ্রাম বাসীদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের স্বার্থে বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। যেমনঃ সেচ সুবিধা বৃদ্ধির জন্য খাল খনন করা, মিষ্টি পানি সরবরাহের জন্য পুকুর খনন করা, রাস্তা ঘাট নির্মান করা, সৌর শক্তির সাহায্যে গ্রামের রাস্তায় আলোর ব্যবস্থা করা। গ্রামবাসীর চিকিৎসার জন্য নিয়মিত মেডিকেল টিম এর ব্যবস্থা করা, সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রামের সুরক্ষার জন্য বাধ নির্মান করা, গ্রামীন জনগোষ্টির পেশায় প্রশিক্ষন প্রদানের ব্যবস্থা করা,সুন্দরবনের উন্নয়ন ও সংরক্ষনে অনেক মানুষ অনেক বুদ্ধি ও পরামর্শ দিতে পারে এবং দিয়েও থাকে। কিন্তু বাস্তবে তারা কেউ সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসে না। বিশেষ করে শীত মৌসুমে প্রচুর ভি,আই,পি সুন্দরবন পরিদর্শনে আসেন। তারা সুন্দরবনে অবন্থান করেন তখন তারা বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ ও আশ্বাস দেন। কিন্তু ফিরে যেয়ে সব ভুলে যায়। সুন্দরবন থেকে মাছ, মধু, শুটকি নেয় সকলেই। সকলেই এর রূপ ও সৌন্দর্য উপভোগ করে। সুন্দরবন তার রূপ সৌন্দর্য ও সামগ্রী সকলকেই বিলিয়ে দেয়। কিন্তু সে কি পায়? এ প্রশ্নের সমাধান খোজা জরুরী।

একটি কথা আমাদের বিশেষভাবে স্মরণ রাখা দরকার যে সুন্দরবন সংরক্ষনের সাথে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটি জড়িত। সুন্দরবন জীবন্ত বিশাল সম্পদের ভান্ডার। এই বিশাল ভান্ডারকে কাজে লাগাতে হবে। শুধুমাত্র সুন্দরবনে ইকোট্যুরিজ্যমের ব্যবস্থা করে আয় করা যায় শত শত কোটি টাকা। পরিকল্পনা অনুযায়ী বনজদ্রব্য আহরণ ও ইকোট্যুরিজমের খাত হতে পারে বিশাল অংকের টাকা যা শুধুমাত্র সুন্দরবন উন্নয়নের কাজে আসবেনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিরাট সহ্য়াক ভৃমিকা পালন করবে। সবচেয়ে বড় কথা সুন্দরবন সংরক্ষণে সুন্দরবন সংলগ্নবাসীদের দরদ থাকতে হবে। তাদের দরদ এবং মায়া থাকলে সুন্দরবনের মধ্যে কাঠচোর, সন্ত্রাসীদের রাজত্ব সহজে হতে পারে না। সুন্দরবন নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার এখনই সময়। বর্তমানে এক ক্রান্তিকালের মধ্যে দিয়ে সুন্দরবনের কাজ কর্ম চলছে। যদি সুন্দরবনের সঠিক সংরক্ষন ও উন্নয়ন না হয় তবে এমন দিন আসবে যখন সুন্দরবন তার রূপ সৌন্দর্য হারাবে এবং এর কারনে বাংলাদেশে নেমে আসবে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয়।

সমাপ্ত।


সুন্দরবনের বাইন গাছ :

বাইন সুন্দরবনের একটি অতি পরিচিত গাছ। এটি একটি চির সবুজ বৃক্ষ। সাধারণতঃ বাইন গাছ ১৩ মিঃ – ২০ মিঃ উচু এবং ৪-৫ মিঃ বেড় হয়ে থাকে। সুন্দরবনের নদী ও খালের পাড়ে বাইন গাছ জন্মিতে দেখা যায়। বাইন গাছ সুন্দরবনের একটি সুউচ্চ বৃক্ষ। ডাল পালা সমেত এ গাছটিকে প্রকান্ড বড় দেখায়। বাইন গাছ একক ভাবে জন্মে থাকে। তবে কোন সময় কেওড়া ও গোলপাতার সাথে জন্মিতে দেখা যায়। বাইন বনের সৌন্দর্য্য ভ্রমনকারীদের আকৃষ্ট করে। বাইন গাছের স্বাস মূল আছে। মার্চ-জুন মাসে বাইন গাছে ফুল ফুটে। তখন অসংখ্য মৌমাছি বাইনের ফুল হতে মধু সংগ্রহ করে। বাইনের মধুকে বাইন মধু বলে। জুলাই আগষ্ট মাসে ফল পাকে। বাইনের বীজ পানিতে ভাসে এবং সে জন্য বাইন বীজ জোয়ার-ভাটার সময় বনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে অংকুরিত হয়। বাইন গাছ শক্তিশালী আলো ডিমান্ডার। সাধারণতঃ এটি একটি নতুন লোনা মাটিতে অগ্রজ প্রজাতি। নতুন মাটি হলেই খাল বা নদীর ধারে বা চরে বাইন জন্মে থাকে। প্রতি বছর বাইন গাছের ২.৮৪ হতে ৬.৩৬ মিঃমিঃ ডায়ামিটার বৃদ্ধি পায়। বাইন গাছ জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন ধরনের বাইন গাছ আছে। যেমন মরিচা বাইন, সাদা বাইন ইত্যাদি।

সুন্দরবনের কাকড়া গাছ :

কাকড়া সুন্দরবনের একটি সুন্দর দৃশ্যমান বৃক্ষ। যেখানে কাকড়া বন আছে সে বন দেখলে অপুর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মন ভরে যায়। কাকড়া গাছ ডালপালা ছাতিম গাছের মত তবে সংখ্যায় নগন্য। কান্ড সোজা সুপারি গাছের মত দেখায় একটু পর পর চক্রাকারে কিছু ডালপালা আছে। মাথায় এক গুচ্ছ ডালপাতা আছে। দেখরে মনে হয় যেন গাছের মাথায় একটি সবুজ ছাতা বসে আছে। কালাবগীর কাছের কাকড়া বন ও করমজলের কাছে কাকড়া বাগান দেখলে অপরূপ সৌন্দর্যে ভ্রমনকারীরা বিমোহিত হয়ে যায়। কাকড়া একটি চির সবৃজ বৃক্ষ। এ বৃক্ষ ৩০ মিঃ পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। কাকড়া গাছের বাকল ধুসর হতে বাদামী রং এর হয়। এ গাছের বেটে বায়বীয় প্রোপ মূল আছে। জুলাই-আগষ্ট মাসে কাকড়া গাছে ফুল আসে এবং আগষ্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ভ্রুন গাছ হতে ঝড়ে পড়ে। ফল গাছে থাকতে বীজ অংকুরিত হয়। কাকড়া আলো ভালবাসে। তবে বাল জীবনে বেশি হাল্কা আলো পছন্দ করে। কাকড়া চারার বৃদ্ধি প্রায় ৩-৪ বছর কম হয়। তারপর বৃদ্ধি খুব দ্র“ত হয়। কাকড়া গাছের কাঠ লালচে বাদামী ও অত্যন্ত শক্ত। এ কাঠ বিম, খুটি, বৈদ্যুতিক খুটি, চিরাই কাঠ ও জ্বালানী কাঠ হিসে্ে ব্যবহৃত হয়। কাকড়া গাছের বাকল হতে টেনিন তৈরী হয়।

সুন্দরবনের পশুর গাছ :

পশুর সুন্দরবনের একমাত্র আসবাবপত্র তৈরীর বৃক্ষ। সুন্দরবনের সর্বত্র পশুর গাছ আছে। পশুর একক ভাবে খুব কম জন্মে। সাধারণতঃ সুন্দরীম গেওয়া ও বাইন গাছের সাথে পশুর জন্মে থাকে। পশুর একটি পত্র ঝরা প্রকান্ড বৃক্ষ। মার্চ-এপ্রিল মাসে পাতা ঝরে যায়। পশুর গাছের স্বাসমূল আছে। গাছে যথেষ্ট ডালপালা থাকে। পাতাগুলো গাঢ় সবুজ। পশুর গাছের স্বাসমুল সাধারণতঃ ৩০-৩৫ সেমি লম্বা হয় এবং দেখতে ডেগারের মত। মে-জুন মাসে গাছে ফুল আসে। জুন-জুলাই মাসে ফল পাকে এবং বীজ মাটিতে পড়ে। জোয়ারের পানিতে বীজ এক স্থান হতে অন্য স্থানে যায়। পশুর বদ্ধ জলাশয় ও আলো পছন্দকারী বৃক্ষ। ইহা যে কোন লবনাক্ততা পছন্দ করে। বীজ হতে প্রাকৃতিক ভাবে গাছ জন্মায়। সাতক্ষীরা ও খুলনা রেঞ্জে বেশি পরিমানে পশুর গাছ দেখা যায়।

সুন্দরবনের কেওড়া গাছ :

কেওড়া সুন্দরবনের আকর্ষণীয় গাছ। নতুন জেগে উঠা চরে সর্বপ্রথম কেওড়া গাছ জন্মায়। চির সবুজ এ বৃক্ষের পাতা চিত্রা হরিেেনর অতি প্রিয় খাদ্য। যেখানে কেওড়া গাছ বেশি সেখানে হরিণও বাস করে বেশী। কেওড়া একক ভাবে জন্মে থাকে। কেওড়া বাগানের দৃশ্য খুবই নয়নাভিরাম। কটকা, কচিখালী, নীলকমল, তিনকোণা দ্বীপ, মান্দারবাড়ীয়ার কেওড়া বন সত্যিই সুন্দর। এ বন ভ্রমনকারীদের মনে আনন্দের খোরাক যোগায়। দুর হতে অবলোকন করলে কেওড়া বনের গাছগুলোকে সমউচ্চতায় এত ঘন ও সবুজ দেখায় যা ভুলবার নয়। কেওড়া বনকে কেওড়া শুটিও বলা হয়। নীলকমলে কেওড়া শুটিতে বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষনের জন্য একটি টাওয়ার আছে। কেওড়া একটি দ্রুত বর্ধনশীল চির সবুজ বৃক্ষ। এটি একটি সুন্দরবনের সুউচ্চ বৃক্ষ। এ বৃক্ষ ৩০ মিঃ পর্যন্ত লম্বা হয় এবং বুক সমান উচ্চতায় বেড় ১.৫ মিঃ পর্যন্ত হয়। কেওড়া কোন কোন সময় গেওয়া, গরাণ বা সুন্দরী গাছের সাথে মিশ্র ভাবে জন্মে থাকে। কেওড়া গাছের কান্ড সোজা ও লম্বা হয়। ডালগুলো নীচের দিকে ঝুলে থাকে। গাছের বাকল গাঢ় বাদামী। শ্বাস মূল ৬০-১৫০ মিমি লম্বা হয়। সুন্দরবনের সর্বত্র কেওড়া গাছ দেখা যায়। জুলাই মাসে ফুল হয় এবং সেপ্টেম্বর মাসে ফল পাকে। কেওড়া ফল খেতে টক লাগে। কেওড়া পাতা ও ফল হরিনের প্রিয় খাদ্য। বনের খুব আনন্দ করে কেওড়া ফল খায়। কেওড়া আলো পছন্দকারী বৃক্ষ। গাছ হতে বীজ পানিতে পড়ে ভেসে এক স্থান হতে অন্য স্থানে যায়। সুন্দরবনে কেওড়া বন প্রাকৃতিক ভাবে বীজ হতে গড়ে উঠে। বড় বৃক্ষের ছায়ার নিচে কেওড়া গাছ জন্মে না। কেওড়া কাঠ টেকসই নয়। তাই এ কাঠ শুধু জ্বালানী কাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সুন্দরবনের কেওড়া কাঠ লট আকারে বিক্রয় নিষিদ্ধ। বাছাই পদ্ধতিতে সরকারী ভাবে কেওড়া কাঠ আহরণ করা হয়। বুক সমান উচ্চতায় ১২ ইঞ্চি ডায়মিটার বা তদউর্দ্ধ গাছ কর্তন করা হয়। মৃত ও মরা গাছও আহরণ করা হয়। কেওড়া গাছ মরে গেলে সে জায়গায় গেওয়া গাছ পরবতীতৈ জন্মে থাকে। উল্লেখ্য যে, পশুর কাঠ লাল এবং টেকসই হয়। উন্নতমানের আসবাবপত্র যেমন খাট, পালংক, সোফা, টেবিল প্রভৃতি পশুর কাঠ দিয়ে তৈরী করা হয়। পশুর কাঠকে সুন্দরবনের সেগুন বা মেহগনি কাঠ বলা হয়।

সুন্দরবনের গরাণ গাছ :

গরাণ সুন্দরবনের বিখ্যাত জ্বালানী কাঠ। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মন গরান জ্বালানী কাঠ সুন্দরবন হতে আহরণ করা হয়। দু’ ধরনের গরাণ সুন্দরবনে আছ। যথা- বাছাই গরাণ ও খাদি গরাণ। একটি গরাণ ঝাড়ে বেশ কটি গরাণ গাছ থাকে। একটি গরাণ গাছ ৫ ফুট বা তদউর্ধ লম্বা হলে এবং গোড়ার ডায়ামিটার ১ ইঞ্চি হলে তাকে বাছাই গরাণ বলে। অপরদিকে জ্ব্লাানী কাঠ উপযোগী খাদি গরাণ কাটা হয়। অতি উত্তম বৃদ্ধি প্রাপ্ত গরাণ গাছ ১র্৪-১র্৬ লম্বা হয়। লবণাক্ত এলাকায় গরাণ বেশি জন্মে। তাই সাতক্ষীরা রেঞ্জের সর্বত্র, খুলনা রেঞ্জের পশ্চিমাংশে এবং সমুদ্র উপকুলবর্তী এলাকায় বেশি গরাণ পাওয়া যায়। সুন্দরবনের উত্তর ও পুর্বাংশে মিঠা পানির অঞ্চল বিধায় গরাণ কম জন্মে। বাছাই ও খাদি গরাণ ছাড়াও আরেক ধরনের গরাণ আছে তাকে মাঠ গরাণ বলে। গরাণের ফুল আসে মার্চ-এপ্রিল মাসে এবং ফল পাকে মে-জুন মাসে। গরানের ফুল হতে মৌমাছিরা মধু সংগ্রহ করে এবং একে গরাণের মধু বলে। মান ও গুনের দিক দিয়ে গরাণের মধু চতুর্থ। গরাণ গাছে বেশি ডালপালা থাকলেও ডালপালাগুলো চিকন হলে সে গরাণকে ঝামটি গরাণ বলে। সুন্দরবনের যে অঞ্চলে গরাণ বেশি পাওয়া যায় সে অঞ্চলে মাটির উর্বরতা শক্তি কম বুঝতে হবে।

সুন্দরবনের ঝানা (গর্জন) গাছ :

ঝানা সুন্দরবনের সৌন্ধর্য্য বর্ধনকারী গাছ। ঝানার অপর নাম গর্জন। সুমদ্রের নিকটবর্তী বনাঞ্চলে গর্জন গাছ বেশি দেখা যায়। ঝানা খাল বা নদীর পাড়ে বেশি জন্মে। অনেক মূল গাছকে মাটির সাথে আটকিয়ে রাখে। খালের অথবা নদীর পাড়ে ঝানা বা গর্জন গাছের সারি দেখলে সত্যই অপুুর্ব লাগে। পাতা প্রাথমিক অবস্থায় বাইন পাতার মত দেখা যায়। পুর্বে ঝানা বেপরোয়া ভাবে জ্বালানীর জন্য কাটার ফলে এ গাছের প্রাপ্তি বর্তমানে সীমিত হয়েছে।

সুন্দরবনের সিংড়া গাছ :

সিংড়া সুন্দরবনের জ্বালানী গাছের মধ্যে অন্যতম। বনের অন্য গাছের নীচে প্রচুর পরিমানে জন্মায়। অধিক হারে কাটার ফলে সিংড়া প্রাপ্তি কমছে।

সুন্দরবনের গোলপাতা গাছ :

গোলপাতা সুন্দরবনের একটি অত্যন্ত সুপরিচিত গাছ। নাম গোলপাতা হলেও কিন্তু গাছের পাতা গোল নয়। আসলে গোলপাতা গাছের পাতা নারিকেল গাছের পাতার মত দেখায়। নদীর বা খালের পাড়ে অপুর্ব সুন্দর পরিবেশে গোলপাতা সারি সারি জন্মায়। গোলপাতা গাছের ফল গোল। তাই গোল ফল হতে গাছের নাম গোলপাতা হয়েছে। গোলপাতা অষ্ট্রেলিয়া, ভারত, বার্মা, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, পাপুয়া নিউগিনি ও বাংলাদেশের লোনা পানির বনে জন্মে থাকে। গোলপাতা গাছের কান্ড খুব ছোট, প্রায় ৭০ সেমি হবে। পাতা ৭ মিঃ লম্বা পর্যন্ত হয়। গোল গাছের ফুল আসে এপ্রিল-মে মাসে এবং ফল পাকে ডিসেম্বর-জানুয়ারী মাসে। জোয়ারের পানির সাথে ভেসে নদী বা খালের পাড়ে মাটিতে পড়ে গাছ হয়। তিন বছর বয়সে গোলপাতা গাছ ফুল ও ফল দিতে শুরু করে। ৫-৬ বছরে গাছ পরিপক্ক হয়। একটি সুস্থ ও সবল গাছ বছরে ৩-৫ টি পাতা দেয়। নতুন প্রতি গাছে ৭-৮ টি পাতা এবং পাতার গড় উচ্চতা ৫ ফুট হতে ৮ ফুট হয়। গোলপাতা ঘরের ছাউনী ও বেড়া তৈরীতে ব্যাপক হয়। গোলপাতার বৃন্ত জ্বালানী হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। গোলপাতার পুপ মঞ্জরী কেটে রস থেকে এলকোহল তৈরী করা যায়।

সুন্দরবনের মালিয়া ঘাস :

মালিয়া ঘাস সুন্দরবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অকাষ্ট বনজ সম্পদ। এ ঘাস নদী ও খালের পাড়ে বেলে দোয়াশ মাটিতে দলবদ্ধভাবে জন্মে। সুন্দরবন ভ্রমনের সময় খালের পাড়ে গাঢ় সবুজ মালিয়া ঘাস গাছের বন দেখলে নতুন অভিজ্ঞতা হয়। ৩-৪ ফুট লম্বা এ ঘাস খুবই সতেজ ও প্রান্ত বন্ত দেখায়। সুন্দরবনের ভিতরে একটানা বৃক্ষের মাঝে এ মালিয়া ঘাসের উপস্থিতি সত্যিই পরিবেশকে মনমুগ্ধ করে তুলে। ভ্রমনকারীদের এক ঘেয়েমি হঠাৎ করে কমে যায়। এ ঘাস দেখতে হোগলা পাতার মত। কিন্তু আকারে ছোট। বাওয়ালীরা মালিয়া ঘাস মে মাস হতে শুরু করে অক্টোবর পর্যন্ত আহরণ করে। চাঁদপাই ও শরনখোলা রেঞ্জে বেশি মালিয়া ঘাস পাওয়া যায়। সাতক্ষীরা রেঞ্জে মালিয়া ঘাস তুলনা মূলক কম পাওয়া যায়। পাশ গ্রহন করে বাওয়ালীরা মালিয়া ঘাস সংগ্রহ করে। কাঁচি, দাও সহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে। মালিয়া ঘাস সংগ্রহের নৌকাগুলো সাধারণতঃ ২০০-৩০০ মনের হয়। এতে ৯-১২ জন বাওয়ালী থাকে। সাধারনতঃ বাওয়ালীরা প্রথমে যে সব এলাকায় মালিয়া ঘাস জন্মে সে সব এলাকায় ভ্রমন করে কত ঘাস পাওয়া যাবে তা অনুমান করে। পরবর্তীতে সে মোতাবেক পারমিট নেয়। মালিয়া ঘাস ছোট ছোট মাদুর তৈরীতে ব্যবহৃত হয়। একটি মাদুর ৪ ফুট লম্বা হয়। এ সব মাদুর খেতে বসতে ও প্রার্থনার কাজে ব্যবহৃত হয়। মহিলারা তাদের কাজের ফাকে ফাকে মালিয়া ঘাস দিয়ে মাদুর তৈরী করে। আশাশুনি, পাইকগাছা, কয়রা, চালনা, মোড়েলগঞ্জে এ মালিয়া ঘাস দিয়ে মাদুর তৈরী করা হয়। সাতক্ষীরা জেলায় বড়দল বাজার সর্ববৃহৎ মাদুর বিক্রয় কেন্দ্র। সুন্দরবন থেকে মালিয়া ঘাস কেটে আনার পর বাড়িতে রোদে ৪/৫ দিন শুকানো হয়। তারপর একটি মালিয়া ঘাস দু’ অংশে বিভক্ত করা হয়। ১০-১৫ কেজি এক বান্ডেল মালিয়া ঘাস শুকালে প্রায় ৪ কেজি হয়। মেয়েরা মাদুর তৈরী করে।

চলবে
সুন্দরবনের বৃক্ষরাজি

সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ হল সুন্দরী ও গেওয়া। সুন্দরবনের গাছপালা সমুদ্রের লোনা পানি ও উপরের মিঠা পানির সংমিশ্রনে গড়ে উঠেছে। সুন্দরবন বিভিন্ন উদ্ভিদ রাজিতে পরিপূর্ণ। সুন্দরবনকে লবন ভুমির বন বলা হয়। এ বন আর্দ্র বন। সুন্দরবনে মোট ৩৩৪ প্রজাতির গাছ গাছরা আছে। এ বনের প্রধান প্রধান গাছপালা হল- সুন্দরী, গেওয়া, গরাণ, গোলপাতা, কেওড়া, বাইন, পশুর, কাকড়া, সিংড়া, আমুর, ধুন্দুল। সবচেয়ে মজার কথা হল সুন্দরবনের যত পশ্চিম দিকে যাওয়া যায় গাছের উচ্চতা তত ছোট দেখায়। আর যত পুর্ব দিকে যাওয়া যায় গাছের উচ্চতা তত বড় দেখা যায়। তেমনি সুন্দরবনের দক্ষিন দিকের গাছ ছোট ও উত্তর দিকের গাছ বড় হয়। সুন্দরবনের পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকের পানির লবণাক্ততা বেশি এবং পুর্ব ও উত্তর দিকে লবনাক্ততা কম। তাই সুন্দরবনের পশ্চিম অংশে সাতক্ষীরা রেঞ্জে গরাণ ও গেওয়া বণ বেশি। আর পুর্ব অংশে খুলনা, চাঁদপাই ও শরনখোলা রেঞ্জে সুন্দরী ও গেওয়া বেশি। সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ স্তরে স্তরে দেখা যায়। নদীর পাড় হতে এসব গাছপালা অবলোকন করলে দেখা যায় প্রথমে নদীর পাড়ে গোলপাতা গড়ে উঠেছে। তারপর পর্যায়ক্রমে বনের ভিতর দিকে গেওয়া, বাইন ও সুন্দরী দেখা যায়। গেওয়া, বাইন ও সুন্দরী প্রাকৃতিক ভাবে সাজানো। এ অপরূপ দৃশ্য দেখলে মনে এক অনাবিল আনন্দের অনুভুতি জোগায়। এসব গাছপালা কোথাও একক ভাবে আবার কোথাও মিশ্রভাবে গড়ে উঠেছে। সুন্দরবনে সবচেয়ে বেশি গাছ আছে সুন্দরী। তারপর গেওয়া, গরাণ ও গোলপাতা। সুন্দরবনে গাছ লাগিয়ে বন তৈরী করা হয় না। গাছ হতে মাটিতে ফল পড়ে প্রাকৃতিক ভাবে বন সৃষ্টি হয়। এর ফলে সুন্দরবনে বন তৈরীতে কোন মূলধন ও পরিচর্যার দরকার হয় না। যুগ যুগ ধরে সুন্দরবন হতে গাছ কাটা হচ্ছে। আর এমনিতেই খালি জায়গায় গাছ জম্মাচ্ছে। সুন্দরবনের মাটির উর্বরতা সব জায়গায় সমান নয়। জায়গার উর্বরতা অনুযায়ী সুন্দরবনকে চার শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। সুন্দরী, গেওয়া, পশুর ইত্যাদি গাছ অতি ধীরে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। তাই সুন্দরী, গেওয়া ও পশুর গাছ কাটার উপযুক্ত সময় ১০৪ – ১৩৫ বছর।

সুন্দরী গাছ

যে বৃক্ষের নাম অনুসারে সুন্দরবনের নাম হয়েছে বলে ধারণা করা হয় সে সুন্দরী বৃক্ষ সুন্দরবনের প্রধান ও আকর্ষণীয় বৃক্ষ। সুন্দরী বৃক্ষের শারীরিক গঠন, উচ্চতা, বেড়, গায়ের রং, জীবনধারণ ও কাঠের ব্যবহার সব মিলিয়ে এটি একটি সুন্দরবনের যে প্রথান বৃক্ষ তা প্রমান করে। সুন্দরবনে পশুদের রাজা যেমন বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার তেমনি গাছের রাজা সুন্দরী। বনের দিকে তাকালে সবুজ ও পিংগল বর্নের পাতা সহ সুউচ্চ যে গাছপালা দেখা যায় সেগুলো সুন্দরী বৃক্ষ। সুন্দরী বৃক্ষ বনের মধ্যে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে। দেখলে খুব সুন্দর লাগে। একটি সুন্দরীবৃক্ষ সাধারণত ২০-২৫ মিটার লম্বা হয়। বেড় সাধারণত ৭/৮ ফুট হয়। সুন্দরী গাছ নদী বা খাল হতে বনের একটু ভিতরে জন্মে থাকে। সুন্দরী গাছ বেশির ভাগ বনে একক ভাবে জন্মে। আবার গেওয়া, বাইন, কাকড়া, পশুর সহ অন্যান্য গাছের সাথে মিশ্রিত ভাবে জন্মে। কখনও কখনও সুন্দরী বৃক্ষ নদী বা খালের পাড়ে দেখা যায়। সুন্দরবনে যত গাছ আছে তার মধ্যে সুন্দরী গাছই বেশি। সুন্দরবন ছাড়াও সুন্দরী গাছ বাংলাদেশের চকোরিয়া সুন্দরবন, বার্মা ও টেনাসেরিম এ জন্মে থাকে। সুন্দরবনের পুর্ব ও উত্তর মধ্য বনাঞ্চলে সুন্দরী গাছের বিপুল সমারোহ ও বৃদ্ধি বেশি। অপরদিকে দক্ষিণ ও পশ্চিম সুন্দরবনে অর্থাৎ সাতক্ষীরা ও খুলনা রেঞ্জের পশ্চিমাংশে সুন্দরী গাছের পরিমানও বুদ্ধি কম। সুন্দরী গাছের কান্ড বেশ লম্বা হয়। সুন্দরী চির সবুজ বৃক্ষ। বছরের কোন সময়ই এক বারে বৃক্ষের পাতা শূন্য হয় না। পাতা বেশ বড় ও গাঢ় সবুজ। সুন্দরী গাছের প্রধান বৈশিষ্ট হল এ গাছের গোড়ায় রাট্রেস থাকে এবং প্রচুর স্বাস মূল হয়। স্বাস মূলগুলো মাটি হতে ৩০-৪০ সেঃমিঃ উচু হয়। সুন্দরী গাছের ফল জুন-সেপ্টেম্বর মাসে হয়ে থাকে। প্রতি ফলে একটি বীজ থাকে। সুন্দরবনের পুর্ব অংশে ফল আগে পাকে এবং পশ্চিম অংশে ফল পরে পাকে। কাঁচা অবস্থায় ফল সবুজ রং ও পাকা অবস্থায় হলুদ রং এর হয়। ৮০-৯০ টি পাকা ফলে এক কেজি হয়। গড়ে প্রতি গাছে ৩০০০ টি ফল হয়। এক বছর বেশি করে ফল দেওয়ার পর পরবর্তী ২-৩ বছর কম ফল দেয় অথবা কোন ফল হয় না। সুন্দরী গাছ সুন্দরবনের নিচু জলমগ্ন জায়গায় বেশি জন্মায়। শুস্ক মৌসুমে যেখানে জোয়ারের পানি উঠে না সেখানে সুন্দরী গাছ সাধারণতঃ জন্মায় না। সুন্দরবনে সুন্দরী গাছ লাগিয়ে বন সৃষ্টি করা হয় না। প্রাকৃতিক ভাবে গাছ থেকে বীজ মাটিতে পড়ে সুন্দরী গাছ জন্মে বিশাল বনাঞ্চল সৃষ্টি হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। জোয়ারের পানিতে সুন্দরী বীচি ভেসে ছোট ছোট খাল দিয়ে বনের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঢুকে সুন্দরী গাছ জন্মায়। সুন্দরী গাছের গোড়া থেকে কপিচ ভাল হয় না। আজকাল সুন্দরবনের অভ্যন্তরে ফাঁকা জায়গায় সুন্দরী চারা দিয়ে বাগান করার চেষ্টা চলছে। পলিব্যাগে চারা করে অথবা বন থেকে চারা সংগ্রহ করে সুন্দরী গাছের বাগান করা যায়। তবে হরিণ বড় শক্র। চারা লাগালেই সময় সুযোগ পেলে হরিণ সব সুন্দরী চারা খেয়ে সাবাড় করে দেয়। সুন্দরী গাছের বৃদ্ধি খুবই কম হয়। প্রতি বছর বনাঞ্চলের উর্বর জায়গায় সুন্দরী গাছের বৃদ্ধি ১.৬ মিঃমিঃ ও খারাপ জায়গায় ৩ মিঃমিঃ হয়। বাংলাদেশের পার্বত্র চট্রগ্রাম, চট্রগ্রাম ও কক্সবাজারের বনাঞ্চলে যেমন বনের সমস্ত গাছ একেবারে কেটে নতুন করে বাগান করা হয়। কিন্তু সুন্দরবনে সব গাছ একেবারে কাটা হয় না। বড় বড় গাছ বেছে কাটা হয়। সুন্দরবনে যে ঘেরে একবার সুন্দরী গাছ কাটা হয় আবার ২০ বছর পর সে জায়গায় সুন্দরী গাছ কাটা হয়। সুন্দরীকাঠ বাংলাদেশের সর্বত্র বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরিশাল, পিরোঝপুর, পটুয়াখালী জেলায় গৃহ নির্মাণ কাজে সুন্দরী বেশি ব্যবহৃত হয়। সুন্দরী খুব শক্ত ও মূল্যবান কাঠ। সহজে পানি বা অন্য কিছুতে নষ্ট হয় না। সুন্দরী সার কাঠ লালচে রং এর হয়। সুন্দরী কাঠ নৌকা, ঘর, ট্রাকের বডি, পুল ইত্যাদি তৈরীতে প্রচুর ব্যবহৃত হয়। সুন্দরী বলি দিয়ে বর্তমানে পাইলিং করা হচ্ছে। তা’ ছাড়া সুন্দরী বলি বৈদ্যুতিক খুটি হিসেবে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে। সুন্দরী কাঠ দিয়ে কাকড়া বানিয়ে জেলেরা এ্যাংকর হিসেবে ব্যবহার করার ফলে অনেক সুন্দরী গাছ অবৈধ ভাবে অকাতরে নষ্ট হচ্ছে। এর ফলে সুন্দরী গাছের পরিমান সুন্দরবনে দিন দিন লোপ পাচ্ছে।

গেওয়া গাছ

সুন্দরবনে সুন্দরী বৃক্ষের পরেই গেওয়ার স্থান। গেওয়া সুন্দরবনের পত্র ঝরা বৃক্ষ। সুন্দরবন ছাড়াও গেওয়া বৃক্ষ পৃথিবীর অন্যান্য লোনা পানির বনে জন্মিতে দেখা যায়। যেমন ভারত, ম্যালেশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া, শ্রীলংকা, সামুয়া প্রভৃতি দেশে। বাংলাদেশের উপকুল অঞ্চলে সুন্দরবন হতে চট্রগ্রাম পর্যন্ত গেওয়া জন্মে থাকে। গেওয়া সুন্দরবনে খালের পাড়ে একক ভাবে এবং অভ্যন্তরে মিশ্রভাবে জন্মে থাকে। গেওয়া গাছের সাথে অন্যান্য যে সব গাছ সহযোগী হিসেবে জন্মে সেগুলো হল সুন্দরী, কাকড়া ও পশুর গাছ। ভ্রমনের সময় নদীর পাড়ে যখন গেওয়া বন চোখে পড়ে তখন গেওয়ার অপুর্ব সমারোহে নয়ন জুড়িয়ে যায়। গেওয়া গাছ উচ্চতায় সুন্দরী গাছ হতে ছোট। সাধারণতঃ ১২-১৫ মিঃ উচু হয়। তবে ১৭ মিঃ উচ্চতায় গেওয়া গাছও সুন্দরবনে পাওয়া যায়। উর্বর স্থানে বুক সমান উচ্চতায় ২০-২৫ সেঃমিঃ বেড়ের গেওয়া গাছ পাওয়া যায়। গেওয়া গাছের স্বাস মূলগুলো সুন্দরী গাছের স্বাস মূল হতে অন্য রকম। সুন্দরী গাছের স্বাসমূল দেখতে পেগের মত চেপ্টা দেখায়। কিন্তু গেওয়া গাছের স্বাস মূল লম্ব্ াগোল আগা পয়েন্টেড (চিকন)। গেওয়া পত্র ঝরা বৃক্ষ। বছরে দু’ বার পাতা ঝরে। একবার এপ্রিল- মে মাসে পাতা ঝরে। আর একবার ঝড়ে সেপ্টেম্বর অক্টোবর মাসে পাতা ঝরে। জুন জুলাই মাসে গেওয়া ফুল ফুটে। তখন অসংখ্য মৌমাছি গেওয়া ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে। গেওয়া ফুল হতে সংগ্রহকৃত মধুকে গেওয়া মধু বলে। গেওয়া ফল আগষ্ট-সেপ্টেম্বর মাসে পাকে। গাছে ফল থাকতেই অংকুরিত হয়। নদীর স্রোতে বনের এক স্থান হতে অন্য স্থানে বীজ ছড়ায়ে গেওয়া বন সৃষ্টি হয়। গেওয়া গাছ সাধারণতঃ অন্য গাছের নিচে জন্মে। কিন্তু ফাঁকা জায়গায় গেওয়া বেশি জন্মিতে ভাল বাসে। গেওয়া গাছ কপিচ হতে জন্মিতে পারে। ১০-১৫ বছর বয়সের গাছ কাটলে গোড়া হতে ভাল কপিচ হয়। প্রতি বারে ১০ বছর বয়সের কপিচ গাছ গড়ে ১ ঘন ফুট কাঠ দেয়। বীজ হতে যে গেওয়া জন্মে তা থেকে কপিচ গেওয়া গাছের বৃদ্ধি বেশি। সুন্দরবনের পুর্ব অংশে গেওয়ার বৃদ্ধি ভাল। পশ্চিম অংশে অর্থাৎ সাতক্ষীরা রেঞ্জে গেওয়ার বৃদ্ধি স্থবির। গাছ ছোট ছোট। বাছাই পদ্ধতিতে সুন্দরবন হতে গেওয়া গাছ আহরণ করা হয়। বিশ বছর কর্তন চক্রে গাছ আহরণ করা হয়। গেওয়া গাছের কস বা রস অতি বিষাক্ত। গায়ে বা চোখে পড়লে ভীষন কষ্ট হয়। শরীরের যেখানে লাগে সেখানে ঘষতে ঘষতে ব্যথা হয়। অনেক সময় ঘা হয়ে যায়। নিউজপ্রিন্ট তৈরী ও ম্যাচ তৈরীতে গেওয়া গাছ বহুল পরিমানে ব্যবহৃত হয়। গেওয়া কাঠ দেখতে সাদা। আজকাল গেওয়া কাঠের ডিংগি নৌকা তৈরী হচ্ছে। গোলপাতা ও গরাণ আহরনের সময় নৌকার দু’পাশে গেওয়া গাছ ঝোল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া গেওয়া ডাবা ও কচা হিসেবেও বাওয়ালীরা ব্যবহার করে। গেওয়া জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

চলবে।
সুন্দরবনে বলেশ্বর নদীঃ বলেশ্বর সুন্দরবনের একটি বিখ্যাত নদী। এ নদী সুন্দরবনের পুর্ব সীমানা দিয়ে প্রবাহিত। বলেশ্বর নদীর পুর্বপাড় পর্যন্ত সুন্দরবন বিস্তৃত। বলেশ্বর নদী পদ্মা নদীর সাথে যোগসুত্র রয়েছে। কুষ্টিয়ার সন্নিকটে পদ্মা থেকে মধুমতি নদীর যাত্রা শুরু হয়। তখন তার নাম হয় গড়াই। গড়াই কুষ্টিয়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে যশোরে প্রবাহিত হয় এবং কুমারের সাথে মিলিত হয়। কুমারের শাখা বারাশিয়া দিয়ে প্রবাহিত হয়। বরাশিয়া থেকে একটি শাখা নদী বের হয়। তার নাম মধুমতি। মধুমতি নদী বাগেরহাট জেলার মোল্লারহাট থানা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কখনও কখনও চিত্রার সাথে মিশে কোন রকমে প্রাণ ধারণ করে পরে শৈলদাহ নাম করণ হয়ে কচুয়া থানা এলাকায় প্রবেশ করে। তখন তাকে বলেশ্বর বলা হয়। কচুয়ায় নিকট পশ্চিমদিক থেকে ভৈরব নদী মিলিত হয়। বাগেরহাট জেলার মোড়লগঞ্জ থানায় চিংড়িখালির নিচে বলেশ্বর পিরোজপুর জেলার প্রবেশ করে ইন্দুরকানি থানাকে জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দক্ষিনে অগ্রসর হয়। প্রথমে কচা, তারপর ঘসিয়াখালী, বিশখালী (পানগুহু) যুক্ত ধারার সাথে মিলিত হয়। এরপর কিছুদুর বলেশ্বর কচা নামে পরিচিত। পরে বলেশ্বর নদী বগী ষ্টেশনের কোল ঘেষে দক্ষিণ দিকে এগুতে থাকে। সুপতি ষ্টেশনের কাছে সুন্দরবনের ভিতর থেকে আসা ভোলা নদী বলেশ্বর নদীর সাথে মিলিত হয়। দক্ষিনে সমুদ্রের দিকে এগুতে থাকে সমুদ্রের কাছাকাছি বলেশ্বর নদী হরিনঘাটা নাম ধারণ করে সমুদ্রে পতিত হয়। এ সমুদ্র মোহনায় বলেশ্বর নদীর পাশ প্রায় ১১ মাইল। সুন্দরবনের বলেশ্বর নদী মৎস্য আহরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। প্রতি বছর ইলিশের মৌসুমে বগী হতে কচিখালী পর্যন্ত জেলেদের কোলাহলে বলেশ্বর নদী মুখরিত হয়ে যায়। বর্ষায় এ নদী ভয়ংকর রুপ ধারণ করে। সে সময় অনেক চোরাই কাঠ ও বনজদ্রব্য নদী দিয়ে পাচার হয় বলে অনুমান করা হয়। ইলিশ মাছ ছাড়া বলেশ্বর নদী হতে পাংগাশ, ভেটকি, পাইস্যা, দাতিনা প্রভৃতি মাছ প্রচুর পরিমানে জেলেরা ধরে থাকে।

সুন্দরবনের শিবসা নদীঃ শিবসা সুন্দরবনের একটি উল্লেখযোগ্য নদী। খুলনা রেঞ্জের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত এ খরস্রোতা নদী বর্ষায় প্রবল ও ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। রাঢ়ুলির পুর্ব পার্শ্বে কপোতাক্ষ নদী হতে শিবসার জন্ম হয়। শিবসা খুলনা রেঞ্জের সদর দপ্তর নলিয়ান ও হড্ডার ক্যাম্পের মধ্যমর্তী এলাকা দিয়ে বিশাল জলরাশি নিয়ে। সুন্দরবনে প্রবেশ করে। শিবসা বর্ষায় এমন প্রলর্য়কারী রূপ ধারণ করে যার ফলে এ নদী দিয়ে লঞ্জ ট্রলার প্রভৃতি জলযান নিয়ে চলাফেরা, টহল দান বেশ দুস্কর হয়ে যায়।

সুন্দরবনের কপোতাক্ষ নদীঃ সুন্দরবনের নদীর মধ্যে কপোতাক্ষ আরেকটি উল্লেখযোগ্য নদী। সাতক্ষীরা রেঞ্জের বিখ্যাত কোবাদক ফরেষ্ট ষ্টেশন কপোতাক্ষ নদীর পুর্ব পাড়ে অবস্থিত। যশোরের চৌগাছার নিকট তাহিরপুর নামক স্থানে ভৈরব এর যে শাখা সোজা দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয় তার নাম কপোতাক্ষ। কপোতাক্ষ নদী যশোরের ঝিকরগাছা, ত্রিমোহনী, মির্জানগর, সাগরদাড়ি অতিক্রম করে খুলনায় প্রবেশ করে। খুলনার অভ্যন্তরে পাটকেল ঘাটা, তালা, কপিলমুনি, আগরঘাটা পার হয়ে রাঢ়ুলির নিকট শিবসার সাথে মিলিত হয়। রাঢ়ুলিয়ার পশ্চিম দিকের প্রবল বাঁক থেকে কপোতাক্ষ খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার সীমন্ত চিহ্নিত করে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়। পথে পশ্চিমে দিক থেকে মরিচাপ ও পুর্ব দিক থেকে শিবসার শাখা কয়রা এসে কপোতাক্ষের সাথে মিলিত হয়ে কোবাদকের সামনে দিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করে। তথায় পশ্চিম দিক হতে আগত খোলাপেটুয়া মিলিত হয়ে আড়পাংগাশিয়া নাম ধারণ করে সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে অগ্রসর হয়। পরবর্তীতে বড়পাংগা, যামুদ সামুদ এবং মালঞ্চ নাম ধারণ করে সমুদ্রে পতিত হয়। কপোতাক্ষের পুর্বের সেই যৌবন বর্তমানে আর নেই। তবে বর্ষাকালে কোবাদকের সামনে প্রবল মর্তা বেড়ে যায়।

সুন্দরবনের খোলপেটুয়া নদীঃ খোলপেটুয়া সুন্দরবনের একটি উল্লেখযোগ্য নদী। সাতক্ষীরা রেঞ্জের সদর দপ্তর বুড়িগোয়ালীনী খোলপেটুয়া নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত। বেত্রবতি বা বেতনা যশোর হতে কলারোয়ায় প্রবেশ করে। আশাশুনির নিকটে বেতনা মরিচাপের সাথে মিলিত হয়। মরিচাপ পশ্চিম সীমান্ত থেকে এসে সাতক্ষীরার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। মিলিত জলধারার এক শাখা পুর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে কপোতাক্ষে পড়েছে। অপরদিকে শোভনালী এসে আশাশুনির পাশে দক্ষিণ মুখী প্রবাহের সাথে মিলিত হয়ে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়। এ মিলিত প্রবাহের নাম খোলপেটুয়া। খোলপেটুয়া দক্ষিনে প্রবাহিত হয়ে পার্শামারীর কাছে কপোতাক্ষের সাথে মিলিত হয়। ডান দিকে শিয়ালীবাশতলী হয়ে প্রবাহিত যমুনার ধারা পরিপুষ্ট গলগাছিয়া পশ্চিম দিক থেকে এসে খোলপেটুয়ার দিকে মিশেছে। খোলপেটুয়া বর্ষাকালে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। এ সময় গোলপাতা ও গড়ানের নৌকা খোলপেটুয়া পাড়ি দিতে বেশ সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়।

সুন্দরবনের রাইমংগল নদীঃ রাইমংগল সুন্দরবনের একটি বিখ্যাত নদী। এর উৎস হল হুগলী নদী। পশ্চিমবংগ হতে প্রবাহিত হয়ে সীমান্তে কালিন্দির সাথে মিলিত হয়ে অগ্রসর হয়। পরে এক শাখা সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে যমুনার সাথে মিলিত হয়ে সমুদ্রে পড়ছে। আরেক শাখা সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত হয়ে হাড়িয়াভাঙ্গার সাথে মিলিত হয়ে সাগরে পড়েছে।

সুন্দরবনের হাড়িয়াভাঙ্গা নদীঃ হাড়িয়াভাঙ্গা সুন্দরবনের আরেকটি সীমান্ত নদী। এ নদী সুন্দরবনকে ভারতের সুন্দরবন হতে পৃথক করেছে। হাড়িয়াভাঙ্গা হুগলি নদীর একটা শাখা। এ নদী ভারতের পশ্চিমবংগ হতে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমানা নির্ধারণ করছে। অপর দিক হতে রাইমংগলের পশ্চিম শাখা এসে হাড়িভাঙ্গার সাথে মিলিত হয়েছে। রাইমংগলের পুর্ব শাখা ও হাড়িয়াভাংগার মধ্যবর্তী দ্বীপের নাম “ তালপট্রি দ্বীপ ”। এর দক্ষিনে নুতন দ্বীপ তালপট্রি অবস্থিত।

সুন্দরবনের ভদ্রা নদীঃ ভদ্রা নদী সুন্দরবনের একটি উল্লেখযোগ্য নদী। এ নদী খুলনা রেঞ্জে অবস্থিত। ভদ্রা সুন্দরবনের মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভদ্রার জন্ম যশোরের ত্রিমোহনীর নিকট কপোতাক্ষ হতে। সুন্দরবনে প্রবেশ পথে ভদ্রা দু’টি শাখায় বিভক্ত হয়। একটি শাখা প্রধান স্রোত নিয়ে সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে পশুরে পতিত হয়। অপর শাখাটি ডানে বেকে গিয়ে শিবসায় পড়ে।

সুন্দরবনের ভোলা নদীঃ এককালে প্রলয়ংকরী ভোলা নদী নিঃস্ব হতে চলেছে। অধুনা ফারাক্কা বাঁধের প্রতিক্রিয়ায় ভোলা নদী আরও মৃত প্রায়। সুন্দরবনের উত্তর সীমানা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শরণখোলা রেঞ্জ সদরের পাশ দিয়ে দক্ষিন পুর্ব দিকে অগ্রসর হয়। ভোলা নদীর উৎপত্তি গৌরম্ভায় পশুর থেকে। মোড়েলগঞ্জের নিকট সুন্দরবনে সীমান্ত এলাকায় প্রবেশ করে। তখন ভোলা নদী সুন্দরবনকে লোক বসতি এলাকা হতে বিচ্ছিন্ন করে ও আকারে বড় হতে থাকে। পশ্চিম দিক হতে খরমা খাল এসে ভ্লোার সাথে মিশে। ফলে পশুরের পানি খরমা হয়ে ভোলায় পড়ে। বর্তমানে এ ধারাটি বন্ধ হয়ে গেছে। শরণখোলা রেঞ্জ সদর অতিক্রম করে দুধমুখী বা পাথুরিয়া গাংগের সাথে মিলিত হয়ে সুপতির কাছে বলেশ্বরে পড়ে। আর সুপতি নদী সোজা দক্ষিনে প্রবাহিত হয়ে কচিখালীর নিকটে সমুদ্রে পড়ে। ভোলা সুন্দরবনের নদী। এর পানি লোনা।

সুন্দরবনে পানীয় জলের অভাবঃ সমগ্র সুন্দরবন নদী ও খালে বিতৃর্ণ থাকলেও সুন্দরবনে পানীয় জলের খুব অভাব। পানির আর এক নাম জীবন। এই পানি যে কতটুকু মূল্যবান তা সুন্দরবনের কর্মচারী কর্মকর্তারা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারে। পানির মধ্যে থেকেও তারা পানির জন্য হাহাকার করে। এক হিসেবে সুন্দরবন হচ্ছে পানির ক্ষেত্রে মরুভৃমি। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে মিষ্টি পানির অত্যন্ত অভাব। সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রায় এক হাজার বন কর্মী কর্মে নিয়োজিত। এ ছাড়া সুন্দরবনের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ সহ অন্যান্য কাজে কয়েক হাজার লোক অবস্থান করে। এদের খাবার পানির জন্য বন বিভাগের দারস্থ হতে হয়। বহুদুর হতে মিষ্টি পানি এনে বনকর্মীরা ব্যবহার করে। এই মিষ্টি পানি অন্যান্য জনসাধারণ যারা সুন্দরবনে আসে তাদের দিতে হয়। প্রকৃতিগত কারণ ও জলযানের অভাবে অনেক সময় পানি সংগ্রহ করা কষ্টকর হয়ে উঠে। সুন্দরবনের পানি মূলত কিনেই পান করতে হয়। সরকারীভাবে পানি দেয়ার তেমন কোন ভাল ব্যবস্থা নেই। সরকারী ভাবে সীমিত সংখ্যক পুকুর খনন করা হয়েছে কিন্তু তাতে সকল সময় মিষ্টি পানি থাকে না। মাঝে মাঝে সরকারী ভাবে সামান্য কিছু পানি সরবরাহ করা হয় তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অতিনগন্ন। পানি সংগ্রহের জন্য অনেক কর্মচারী বাধ্য হয়ে নিয়ম বহির্ভুত কাজ করে জ্বালানী কাঠের বিনিময়ে খাবার পানি সংগ্রহ করে। এটি একটি কমন অনিয়ম। শুধুমাত্র পানীয় জলের অভাব নয়। চিকিৎসার ভীষণ সমস্যা সুন্দরবনে। অনেক কর্মচারী চিকিৎসার অভাবে মারা গিয়েছে। সুন্দরবনে প্রতিদিন গড়ে ৫ হ্জাার লোক অবস্থান করে। এদের ভাল চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা নেই। এ সমস্যাটি সমাধান হওয়া দরকার। অথচ এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না হওয়ায় চিকিৎসা ছাড়া অমানবিক অবস্থার মধ্যে এদের সুন্দরবনের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হয়। সুন্দরবনকে যদি যথাযথভাবে সংরক্ষন করার আন্তরিক ইচ্ছা পোষন করা হয় তা হলে পানীয়জল ও চিকিৎসার সমস্যা সমাধান করা খুবই জরুরী।
.
চলবে
সুন্দরবনের নদী নালাঃ সুন্দরবন অসংখ্য ছোট ছোট নদী নালা দ্বারা বেষ্টিত। এসব নদী,খাল ও ভারানী দ্বারা সুন্দরবনের কম্পার্টমেন্টগুলোকে একটি থেকে আরেকটিকে আলাদা করা হয়েছে। যখন একটি ছোট খাল দু’ টি নদীকে যুক্ত করে তাকে ভারানী বলে। সুন্দরবনে প্রবেশ করলে মনে হয় সুন্দরবনে শুধু পানি আর পানি। যত দক্ষিণ দিকে যাওয়া যায় ততই নদীর প্রস্থতা ও ভয়ংকরতা বাড়তে থাকে। সমগ্র সুন্দরবনের ৩০ ভাগ পানি। সুন্দরবনের মোট জল ভাগের পরিমান ১৭৫৬ বর্গ কিঃ মিঃ। বর্ষার সময় সুন্দরবনের কোন কোন বড় নদী ভয়ংকর হয়। এত বড় ঢেউ হয় তাতে যেমন তেমন লঞ্চ এসব নদী দিয়ে চলাচল করতে পারে না। সুন্দরবনের বিখ্যাত ও ভয়ংকর নদীর মধ্যে পশুর, শিবচা, আরপাংগাশিয়া, খোলপেটুয়া, মর্যাদ, যমুনা, মালঞ্চ ও বলেশ্বর উল্লেখযোগ্য। পশুর, মর্যাদ, বলেশ্বর, মালঞ্চ ও রাইমংগল নদী সমুদ্র মোহনায় প্রায় ৮-১০ কিঃ মিঃ প্রস্থ। এপার থেকে ওপার দেখা যায় না। বর্ষাকালে এসব নদী লঞ্চ, ট্রলার ও স্পীড বোট দিয়ে পাড়ি দেওয়া দুস্করঅ এক একটা ঢেউ পাহাড়ের মত মনে হয়। সুন্দরবনে আরো উল্লেখযোগ্য নদীর মধ্যে রয়েছে শেলা, মিরগামারী, ভোলা, সুপতি, বেতমোড়, হংসরাজ, ভদ্রা, বল, পাথরিয়া প্রভৃতি। এসব নদীতে কুমির বাস করে। তাছাড়া এসব নদী মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি মাছ, চিংড়ি মাছের পোনা প্রভৃতি মৎস্য সম্পদে ভরপুর। মোট নদ নদীর সংখ্যা এক হাজারের ও বেশী হবে।

জোয়ার ভাটাঃ জোয়ার ভাটা সুন্দরবনের একটা বৈশিষ্ট। বৃক্ষরাজির জীবনধারণ, পশু পাখির চলাফেরা, জেলে, মৌয়ালী ও বাওয়ালীদের কর্মতৎপরতা ও বন ব্যবস্থাপনা অনেকাংশে জোয়ার ভাটার উপর নির্ভরশীল। সুন্দরবনে প্রতিদিন দু’ বার জোয়ার হয় এবং দু’ বার ভাটা হয়। জোয়ারের সময় সমুদ্রের লোনাপানি সুন্দরবনের ভিতরে প্রবেশ করে বনাঞ্চল প্লাবিত করে। নদী নালা পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। পানির সাথে সমুদ্র হতে সে সময় বিভিন্ন মাছ সুন্দরবনে নদ নদীতে আসে। ইলিশের মৌসুমে জোয়ারের সময় প্রচুর ইলিশ সুন্দরবনে প্রবেশ করে। জানুয়ারী হতে এপ্রিল মাসে জোয়ারের পানির সাথে ভেসে আসে কোটি কোটি চিংড়ি পোনা। জেলেদের জালপাতার হুড়াহুড়ি দেখলে মনে হয় এখনই জোয়ার হবে। যখন জেলেরা জাল গুটিয়ে ফেলতে শুরু করে তখন বুঝা যায় ভাটা হয়েছে। যখন ভাটা হয় তখন জেলেরা বিশ্রাম নেয় এবং জোয়ার এলে মাছ ধরার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। তেমনি ভ্রমনকারী, বনকর্মী ও মৎস্য পরিবহনকারীগন জোয়ার ভাটার সময় হিসেব করে চলাফেরা করে। অনেক সময় এ কারনে যাত্রা বিলম্ব হয়। যে দিকে পানির স্রোত যায় সেদিকে চললে সময় কম লাগে এবং অর্থ সাশ্রয় হয়। সাধারণত জোয়ারের সময় জোয়ারের দিকে এবং ভাটার সময় ভাটার দিকে অনুসরণ করে লঞ্চ চলাচল করে। নদ নদীর ঢেউয়ের প্রবনতা জোয়ার ভাটার উপর নির্ভরশীল। গ্রীষ্মকালে বাতাস দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়। সে সময় যথন ভাটা হয় তখন নদীতে বেশী ঢেউ হয়। কারণ গ্রীষ্মকালে ভাটার সময় পানি যায় দক্ষিণ দিকে আর বাতাস প্রবাহিত হয় উত্তর দিকে। তখন পানির স্রোত বাতাসে বাধাগ্রস্থ হয়ে ঢেউয়ের সৃষ্টি করে। শীতকালে বাতাস উত্তর দিক হদেক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়। সে সময় জোয়ারের সময় নদীতে ঢেউ বেশী হয়। সে জন্য নাবিকরা বর্ষাকালে যখন জোয়ার থাকে তখন সুন্দরবনের ভয়ংকর নদীগুলো পাড়ি দেয়। কারণ এসময় পানি ও বাতাস একই দিকে প্রবাহিত হয়। ফলে ঢেউ কম থাকে। পুর্নিমা অমাবস্যার জোয়ারের সময় বেশি পানি সুন্দরবনে প্রবেশ করে এবং সে সময় বেশী মাছ পাওয়া যায়। একবার জোয়ার ভাটা হতে সময় লাগে ১২ ঘন্টা ২৫ মিনিট। সমুদ্র হতে সুন্দরবনের উত্তর অংশ পর্যন্ত জোয়ার হতে সময় লাগে ২ ঘন্টা ৫ মিনিট। বলেশ্বর, শিবসা, পশুর, রাইমংগল, যমুনা ও মালঞ্চ নদীর মোহনা দিয়ে প্রধানত সমুদ্রের পানি সুন্দরবনে প্রবেশ করে। তারপর অন্যান্য নদী, খাল ও ভারানী দিয়ে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে বিস্তৃতি লাভ করে। জোয়ারের সময় সুন্দরবনের পানি স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে ৩ মিটার উচ্চতা বাড়ে। হিরণ পয়েন্টে পূর্ণ জোয়ার ও নলিয়ানে পূর্ণ জোয়ারের পার্থক্য হল ২.৫০ ঘন্টা। বিভিন্ন নদীর ম্হোনা দিয়ে সমুদ্র হতে সুন্দরবনে বিভিন্ন অংশে পানি প্রবেশের উপর ভিত্তি করে সুন্দরবনে নদীগুলোকে তিনটি সিরিজে ভাগ করা হয়েছে। যথা- (১) রাইমংগল, শিবসা সিরিজ, (২) পশুর ু শিবসা সিরিজ ও (৩) পশুর- বলেশ্বর সিরিজ।

রাইমংগল- শিবসা সিরিজঃ এ সিরিজে প্রধান প্রধান নদী ও খালের নাম হল রাইমংগল, যমুনা, মালঞ্চ, ফিরিগিং, আরপাংগাশিয়া, আড়াইবেকী, শিবসা, সোনাখাল, তালদ্বীপ ও কোবাদক। রাইমংগল নদী ভারত হতে বাংলাদেশে কৈখালীর নিকট যমুনাতে মিশেছে।

পশুর- শিবসা সিরিজঃ এ সিরিজের অন্যতম নদী ও খাল হলো পশুর, শিবসা, মরা ভদ্রা, মানকি ও ভদ্রা নদী।

পশুর- বলেশ্বর সিরিজঃ এ সিরিজে উল্লেখযোগ্য নদী ও খাল হল পশুর, বলেশ্বর, বড় শিয়ালা, মিরগামারী, শেলা, ভোলা, সুপতি, পাথরিয়া, বেতমোর ইত্যাদি। জোয়ার ভাটা সুন্দরবন পরিদর্শন ও কাজ কর্মে মুখ্য ভৃমিকা পালন করে। জোয়ারের সময় নৌকা, লঞ্চ, স্পীড বোট ও ট্রলার হতে বনে উঠা-নামা করতে সুবিধা বেশী। বনের কাঠ, লাকড়ী, নৌকায় ভর্তি করতে সুবিধা বেশি। এ সময় নদী বা খালের পানি বনের মেঝের কাছাকাছি থাকে। ফলে নৌযান বনের পাড়ে ভিড়ানো যায়। ভাটা হলে পানি নদী খালের তলায় এসে যায়। ফলে বনের পাড়ে নৌকা ভিড়ানো কষ্টকর। তখন বনে উঠতে গেলে এক হাটু কাঁদা পানি দিয়ে বনে ঢুকতে হয়। এমন কি অনেক সময় কোমর পর্যন্ত কাদা হয়। ভাটার সময় ছোট ছোট খাল শুকিয়ে যায়। তখন ইচ্ছা করলে গহীন বনে প্রবেশ করা যায় না।

সুন্দরবনের পশুর নদীঃ বিখ্যাত যে সব নদী সুন্দরবন সংরক্ষন ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভৃমিক্ ারাখে পশুর নদী তাদের মধ্যে অন্যতম। পশুর সুন্দরবনের একটি অন্যতম বৃহত্তম নদী। বাংলাদেশের দ্বিতীয় সামুদ্রিক বন্দর “ মংলা ” পশুর নদীর তীরে অবস্থিতঅ পশুর বর্ষাকালে বেশ ভয়ংকর ধারণ করে। সে সময় ছোট ঝোট লঞ্চ পশুর নদী পাড়ি দিয়ে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে যাওয়া বেশ মুশকিল। ফকিরহাট থানার বিলাঞ্চল হতে পশুরের জন্ম।এরপর চালনা বাজারের নিকট পশুর নদী রুপসা এবং পানখালীর সাথে মিশে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়। মংলা বন্দরের নিকট এসে মংলা নদীর সাথে মিলিত হয়ে সুন্দরবনের ঢাংমারী ফরেষ্ট ষ্টেশনের পাশ দিয়ে সোজা দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হতে থাকে। তখন পশুরের পশ্চিম পাড়ে সুন্দরবন এবং পুর্বপাড়ে কৃষি জমি ও জনপদ থাকে। এ ভাবে চলতে চলতে চাঁদপাই রেঞ্জের নন্দবালার নিকট হতে পশুর গভীর সুন্দরবনে প্রবেশ করে। তখন এর দু’ পাড়েই সুন্দরবন এভাবে চলতে তিন কোনা আইল্যান্ডের পশ্চিমে শিবসা সাথে মিলিত হয়ে মর্যাদ বা কোংগা নামে সমুদ্রে পড়ে। পশুরের আরেকটি ধারা দুবলার পুর্বদিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রে পড়েছে। একে মরা পশুরও বলে। এখানে উল্লেখ্য যে, পুর্বে ভৈরব ও পশুর নদীর সাথে কোন সংযোগ ছিল না। নড়াইল জেলার ধোন্দা গ্রামের রূপচাঁদ সাহা লবনের নৌকা যাতায়াতের জন্য ভৈরব নদী ও কাজিবাছা নদীকে সংযোগ করার জন্য একটি চিকন খাল কেটে দেন যা বর্তমানে রূপসা নদী নামে পরিচিত। প্রথমে এ খাল লাফ দিয়ে পার হওয়া যেত। পরবর্তীতে বাঁশের সাঁকোতে লোক জন পার হত। বর্তমানে রূপসা একটি গভীর, প্রশস্থ ও ভয়ংকর নদী। রূপচাঁদ সাহা ন্মা অনুসারে নদীর নাম হয় রূপসা।
সুন্দরবনের মৌমাছি ও মৌচাক : বৃক্ষ ও মাছের পাশাপাশি সুন্দরবন বাংলাদেশের মধ্যে মধু উৎপাদনে সর্বশ্রেষ্ঠ। সুন্দরবনের মধু গুনে ও মানে বেশ সুখ্যাতি আছে। বিশুদ্ধতাও সুন্দরবনের মধুর জুড়ি নাই। প্রতি বছর হাজার হাজার মন মধু ও মোম সুন্দরবন হতে উৎপাদন হয়। বাংলাদেশের দু’ ধরনের মৌমাছি আছে। এপিস সিরানা ও এপিস ডড়সেটা। এপিস সিরানা মৌ চাষের জন্য ব্যবহার করা হয়। আর এপিস ডগসেটা বন্য ও হিংস্র মৌমাছি। এরা গাছ গাছড়ায় বাসা বাঁধে ও এক স্থান হতে অন্য স্থানে চলে যায়। সুন্দরবনের মৌমাছির নাম হল এপিস ডড়সেটা। এ বন্য মৌমাছিরকে পোষ মানানো যায় না। মৌমাছি ফুলের মধু ও রেনু খেয়ে জীবন ধারণ করে। এপিস ডড়সেটা মৌমাছিকে জায়ান্ট মৌমাছিও বলে।

শত শত লোক প্রতি বছর সুন্দরবন হতে যে মধু ও মোম সংগ্রহ করে তাদেরকে মৌয়ালী বলা হয়। সুন্দরবনে নানা ধরনের উদ্ভিদ আছে। প্রায় গাছেই ফুল ফুটে। কিন্তু সব গাছ হতে মৌমাছি মধু সংগ্রহ করে না। সুন্দরবনের যে সব গাছ হতে মৌমাছি মধু সংগ্রহ করে সেগুলো হল- খলসী, বাইন, সাদা বাইন, কাকড়া, গরান, গেওয়া, ঝানা(গর্জন), কেওড়া, ছইলা, পশুর, হারগাছা, শিংড়া। সুন্দরবনকে লবনাক্ততার উপর নির্ভর করে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা- লবন পানির এলাকা, মধ্যম লবন পানির এলাকা ও মিঠা পানির এলাকা।

সুন্দরবনের পশ্চিম অংশ হল লবণ পানির এলাকার অন্তর্ভূক্ত, শরণখোলা রেঞ্জ হল মিঠা পানির এলাকার অন্তর্ভূক্ত। সুন্দরবনে বেশী মধূ উৎপন্ন হয় লবন পানির অঞ্চল হতে। অর্থাৎ সুন্দরবরে যে চারটি রেঞ্জ আছে তম্মধ্যে সাতক্ষীরা রেঞ্জে বেশী মধু উৎপন্ন হয়। সংক্ষেপে বলা যায় সুন্দরবনের প্রায় ৯০ ভাগ মধু সাতক্ষীরা রেঞ্জের বনাঞ্চল হতে উৎপন্ন হয়। এর কারণ হল সাতক্ষীরা রেঞ্জের বনাঞ্চলে প্রচুর মধু উৎপাদনকারী গাছ যথা- খলসী, গরাণ, গেওয়া, কেওড়া প্রভুতি গাছ আছে। মৌমাছি যে সব গাছ হতে মধু সংগ্রহ করে তার উপর নির্ভর করে সুন্দরবনের মধূকে সাধারনত চার ভাগে ভাগ করা হয়। যথা খুলাসীর মধু, গরানের মধু, কেওড়ার মধু ও গেওয়ার মধু। তম্মধ্যে খলসীর মধু মানে ও গুনে সব চাইতে বেশী ভাল। তারপর যথাক্রমে গরাণ, কেওড়া ও গেওয়ার মধু। বছরের প্রথমে খলসীর মধু উৎপন্ন হয়। কারণ খলসী ফুলফুটে সবার আগে। মার্চ ও এপ্রিল মাসে খলসী গাছে প্রচুর ফুল থোকায় থোকায় ফুটে। খলসী গাছ নদীর চরে সারিবদ্ধভাবে গোলপাতার পাশে জম্মায়। খলসী গাছ ১৫-২০ ফুট লম্বা হয়। অনেক দুর থেকে মৌমাছি খলসী গাছের ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করতে আসে।

সুন্দরবনে সারা বছর মধু পাওয়া যায় না। বছরের চার মাস মধু সংগ্রহের কাজ চলে। এ সময় মৌয়ালীদের মধু সংগ্রহে বেশ ব্যস্ত থাকতে হয়। এপ্রিল মাসের ১লা তারিখে ফরেষ্ট ষ্টেশন হতে পাশ দেয়া হয়। ঐদিন প্রতি ষ্টেশনে মৌয়ালীদের নিয়ে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সমাবেশে কিভাবে মধু সংগ্রহ করতে হবে এবং বনের ভিতর মৌমাছি ও বন্য প্রাণীর আক্রমন হতে কিভাবে রক্ষা পাওয়া যায় তা আলোচনা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তারপর এক রাউন্ড গুলি করে ফাকা আওয়াজ করা হয়। ফাঁকা আওয়াজের সাথে সাথে মৌয়ালীরা তাদের নৌকা নিয়ে ছোটে বনের ভিতর। প্রতিযোগিতা শুরু হয় আগে কে যাবে বনের ভিতর জায়গা দখলের জন্য। যে যেখানে পৌছে সেখান থেকেই মধু আহরণ করে সারা মৌসুম। সে জায়গায় অন্য মৌয়ালী মধু আহরণ করে না। এ প্রথা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। মৌয়ালীরাও এটা খুব শক্ত করে মনে প্রাণে অনুসরণ করে।
বণ হতে মধূ সংগ্রহ করা বেশ কষ্টকর ও ভীষন ঝুকিপূর্ণ কাজ। মধু সংগ্রহের সময় মৌমাছি দ্বারা মৌয়ালীরা আক্রান্ত হতে পারে। সুন্দরবনে অসংখ্য বাঘ আছে। যেকোন সময়েই মৌয়ালীরা বাঘের সম্মুখীনও হতে পারে। তাই মৌয়ালীরা সব সময় দলবদ্ধভাবে মধু সংগ্রহ করে।

এক এক দলে ৭ জন মৌয়ালী থাকে। মধু সংগ্রহের সময় প্রতি বছর বেশ ক’জন মৌয়ালী বাঘের হাতে মারা যায়। মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে মৌয়ালীরা বাঘের হাতে মারা যাচ্ছে শুনলে মনে খুব ব্যথা ও কষ্ট লাগে। ভাবতে অবাক লাগে যে, তারা জীবনকে বাজি রেখে সুন্দরবন হতে মধু সংগ্রহ করে। আমরা কি তাদের নিরাপত্তা দিতে পারি না ? তবে হ্যা মধু সংগ্রহের সময় চোখ ও কান খোলা রেখে মধূ সংগ্রহ করতে হবে।

অবশ্য এসব কথা বাওয়ালীদের বনে প্রবেশ করার আগে বলে দেওয়া হয়। কিন্তু বনে প্রবেশ করে মৌমাছির বাসা খুজতে খুজতে মৌয়ালীরা যখন ব্যস্ত থাকে, কোন দিকে লক্ষ থাকে না ও দিশেহারা হয়ে যায় তখন তারা বাঘের কবলে পড়ে। মধু সংগ্রহের সময় মৌয়ালীরা প্রথমে মৌমাছির ব্সাা সনাক্ত করে। তারপর তারা মৌমাছির বাসায় ধুয়া দেয়। যখন ধুয়ার তীব্রতায় মৌমাছি টিকতে পারে না তখন মৌমাছিরা বাসা ছেড়ে চলে যায়। এরপর মৌয়ালীরা চাক হতে মধু ও মোম কেটে পাত্রে রাখে। অতঃপর মধু ও মোম পৃথক করে আলাদা পাত্রে রাখা হয়। মৌয়ালীরা সাধারণতঃ মটকায় মধু রাখে। মধু আহরণ কালীন চাকের যে অংশে মধু থাকে সে অংশ কেটে মধু সংগ্রহ করা হয়। শুধুমাত্র পরিপক্ক মৌচাক হতে মধু সংগ্রহ করতে হয়।

সুন্দরবনের মৌমাছি গ্রামাঞ্চলের মৌমাছি হতে বড়। মৌমাছি সাধারণত মাটি হতে ৫-১৫ ফুট উচুতে মৌচাক তৈরী করে। মৌমাছির মধু সংগ্রহ বাড়ার সাথে সাথে মৌচাকের আকার বাড়ে। কোন কোন চাকে ২০-৩০ কেজি মধু পাওয়া যায়। মৌমাছিদের জীবন ধারণ আশ্চর্য্যরে বিষয়। মৌমাছি সমাজবদ্ধ জীব। এরা দলবদ্ধভাবে বাসা বেধে বাস করে। এত ক্ষুদ্র জীব অথচ এদের এত নিয়মকানুন এবয় এ সব নিয়ম কানুন প্রতিটি মৌমাছি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। একটি মৌমাছির দল একটি ব্সাা বাধে। প্রতি বাসায় বা মৌচাকে একজন রাণী মৌমাছি থাকে। রাণী মৌমাছির অধীনে একদল স্ত্রী মৌমাছিও একদল পুরুষ মৌমাছি থাকে স্ত্রী মোমাছি প্রজনন অক্ষম থাকে। এদেরকে শ্রমিক মৌমাছি বলে। পরিমানের দিক দিয়ে এক এক মৌচাকে কয়েক হাজার শ্রমিক মৌমাছি থাকতে পারে। পুরুষ মৌমাছি এক কলনীতে প্রায় কয়েক শত থাকে। পুরুষ মৌমাছিকে ড্রোন্স বলে। মৌচাকে তিন ধরনের কোষ থাকে। যথা শ্রমিক কোষ, ড্রোন্স কোষ ও রানী কোষ। শ্রমিক কোষ আকারে ছোট এবং ড্রোনস কোষ আকারে বড় হয়। বাসার মধখানে শ্রমিক কোষে মৌমাছির অপ্রাপ্ত বয়স্ক মৌমাছি লালন পালন করে। বাসার উপরের অংশে মধু সঞ্চয় করে। বাসার পার্শ্বে পরাগ ও নেকটার সঞ্চয় করে। ড্রোন কোষে মৌমাছি ড্রোন লালন পালন করে। রাণী কোষে রাণী মৌমাছিকে লালন পালন করা হয়। বিশেষ বংশ বৃদ্ধির নিমিত্তে নৃতন ঝাক বা দল গঠন করার জন্য রাণী কোষ তৈরী করা হয়।

সুন্দরবনের মধূ : ডিম হতে রানী মৌমাছি তৈরী হতে ১৬ দিন সময় লাগে। শুক কীট হতে পূর্ণাংগ রানী মৌমাছি হওয়া পর্যন্ত তাকে রয়েল জেলী খাওয়ানো হয়। শ্রমিক মৌমাছির হাইফোফিরিনজিয়াল গ্রন্থি হতে রয়েল জেলী নিঃসৃত হয়। রয়েল জেলী চর্বি ও পোটিনে সমৃদ্ধ। ৫ দিন বয়সের কুমারী রানী মিলনের জন্য আকাশে উড়তে থাকে। এক বা একাধিক উড়ার সময় কুমারী রাণী মৌমাছি প্রায় ৭টি ড্রোনের সাথে মিলিত হয়। রাণীর বীর্যধারে ড্রোনের বীর্য সারা জীবন সঞ্চিত থাকে। একটি রাণী ৫ বছর পর্যন্ত বাঁচে। তবে প্রথম দু’ বছর তার কাজের আগ্রহ ও তীব্রতা বেশি। একটি কলোনী বা মৌচাকে একটি রাণী মৌমাছি কয়েকশ’ হতে কয়েক হাজার ডিম পাড়ে। ডিম পাড়ার সংখ্যা কম বেশি নির্ভর করে রাণীকে ভাল খাওয়ানো ও ডিম পাড়ার জন্য চাকের ভিতর খালি কোষের প্রাপ্যতার উপর।

মৌমাছির বাসায় বা কলোনীতে সামাজিক শৃংখলা বজায় রাখার জন্য রাণী মৌমাছি ফেরোমোন নামক এক ধরনের পদার্থ তৈরী করে। একে কুইন সাবষ্ট্যান্স বা রাণী নির্যাস বলে। মৌচাকে রাণী নির্যাস ছড়িয়ে দেয়া মৌমাছিদের জীবনে একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। রাণী নির্যাসের উপস্থিতির জন্য শ্রমিক মৌমাছিরা বুঝতে পারে রাণী মৌমাছি বাসায় আছে কি নেই। কনিষ্ঠ শ্রমিক মৌমাছিরা রাণী মৌমাছিকে খাবার পরিবেশন করে। শরীর ফুটো করে রাণী নির্যাস বের করে। অন্যরা মৌমাছির মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। কনিষ্ঠ মিলিত রাণী বেশি পরিমাণে রাণী নির্যাস উৎপাদন করে বিধায় শ্রমিক মৌমাছির ডিম্বাশয়ে পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। বয়স্ক রাণী মৌমাছি সামান্য পরিমাণে রাণী নির্যাস উৎপন্ন করে। এর ফলে শ্রমিক মৌমাছিদের ডিম্বাশয়ে পূর্ণতা লাভ করে। তখন এরা রাণী কুঠরী তৈরী করে থাকে। কোন কারনে যখন রাণী মৌমাছি বৃদ্ধ হয়ে যায় তখন পূর্ণ ডিম্বাশয় যুক্ত শ্রমিক মৌমাছি রাণীর স্থল দখল করে। এ প্রকার রাণীকে সুপারসিডর রাণী বলে। আবার যখন মৌচাকে শ্রমিকের সংখ্যা বেশী হয়ে যাবার ফলে জায়গার অভাব হয়, বিপুল সংখ্যক মৌমাছিদের মধ্যে একটি মাত্র রাণীর নির্যাস খুব নগন্য হয় এবং প্রচুর সেবিকা মৌমাছি একটি রানী মৌমাছিকে সেবা করে তাদের গ্রন্থির জেলী শেষ করতে পারে না তখন তারা নতুন রাণীর কোষ তৈরী করে। নতুন রাণী ফুটে বেরিয়ে আসার আগেই পুরান রাণী কিছু শ্রমিক মৌমাছি নিয়ে মৌচাক ত্যাগ করে এবং নতুন জায়গায় গিয়ে চাক তৈরী করে। নতুন রাণী মৌমাছির কাজ অব্যাহত রাখে।

কোন কারণে রাণী হারিয়ে বা মৃত্যু হয়ে গেলে নতুন রাণী জন্ম হয়। এ প্রকার রাণীকে জরুরী রাণী মৌমাছি বলে। শ্রমিক মৌমাছিও নিষিক্ত ডিম হতে জন্ম নেয়। ডিম হতে পুর্ণাঙ্গ শ্রমিক মৌমাছি তৈরী হতে সময় লাগে ২১ দিন। শ্রমিক মৌমাছি কি ধরনের কাজ করবে তা নির্ভর করে তাদের শরীর বৃদ্ধি ও কাঠামোগত প্রস্তুতির উপর। আবহাওয়ার উদ্দিপক এবং কলোনীর চাহিদার উপর শ্রমিক মৌমাছির শরীর বৃদ্ধির ও বাহ্যিক গঠন প্রজনন ছাড়া সব ধরনের কাজ করার জন্য উপযুক্তভাবে তৈরী। এদের দেহে নেকটার সংগ্রহের জন্য জিহবা ও মধু থলি, পরাগ সংগ্রহের জন্য পরাগ থলি, রয়েল জেলি তৈরীর জন্য গ্রন্থি প্রস্তুতের জন্য এনজাইম, চাক তৈরীর জন্য মোম ও বাসা রক্ষার জন্য ভেনম আছে। শ্রমিক মৌমাছি গ্রীষ্মকালে চার সপ্তাহ এবং শীতকালে ছয় মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকে। শ্রমিক মৌমাছি কখনো ঘর মৌমাছি এবং কখনো মাঠ মৌমাছি হিসাবে কাজ করে থাকে। কোষ হতে বের হওয়ার সাথে সাথে এরা নেকটার বা পাতলা মধুর সাথে পরাগ মিশ্রিত খাবার গ্রহণ করে। একদিন বয়সে শ্রমিক মৌমাছি চাকের কোষ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে। ৫ দিন পর্যন্ত এরা বয়োজ্যেষ্ঠ শুককীটদের মিশ্রিত খাবার এবং রাণী মৌমাছিকে রয়াল জেলী খাওয়ায়। ৫-৮ দিনের মধ্যে শ্রমিক মৌমাছি দিক নির্ণয়ক এবং পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ফ্লাইটে যায়। প্রচুর পরিমানে মধু গ্রহনের ফলে ৮ দিন বয়সে শ্রমিক মৌমাছির বুকের নীচে চার জোর মোম গ্রন্থি তৈরী হয়। এসব গ্রন্থি হতে প্রচুর পরিমানে মোম নিঃসৃত হয় যা বাসা তৈরী ও কোষের মুখ বন্ধ করার কাজে লাগে। ১১ দিন বয়সে শ্রমিক মৌমাছির লালা গ্রন্থি তৈরী হয় যা দ্বারা এরা নেকটারকে মধুতে রূপান্তর করে। এরা মাঠ মৌমাছিদের নিকট হতে নেকটার গ্রহণ করে। এরপর নেকটারের সাথে এনজাইম ইনভাটেক মিশ্রিত করে নেকটারে রক্ষিত সুক্রোজকে ভেংগে ফ্রুকটোজ এবং গ্লুকোজে রূপান্তর করে। মধূ হতে অতিরিক্ত জলীয় অংশ বের করার জন্য শ্রমিক মৌমাছিরা তাদের প্রবোসিস দিয়ে চাকের ভেতরে পাখার মাধ্যমে প্রবাহিত গরম বাতাসের মধ্যে ধরে রাখে।

১৪ দিন বয়সে শ্রমিক মৌমাছি আলো বাতাস চলাচলের মাধ্যমে চাকে তাপমাত্রা বজায় রাখতে সক্ষম হয়। ১৮ দিন বয়সে কলোনীতে অবস্থানরত মৌমাছিরা চাকের প্রহরার কাজের জন্য উপযুক্ত হয়। কারণ এ সময় তাদের পেটের শেষ প্রান্তে বিষাক্ত গ্রন্থি তৈরী হয়। সাধারণত ৩ সপ্তাহ বয়সে শ্রমিক মৌমাছি মধু সংগ্রহের জন্য মাঠে যাওয়া শুরু করে। প্রথমে শ্রমিক মৌমাছি যখন মাঠে যাওয়া শুরু করে তখনও এদের গায়ে লোম থাকে।

তখন এরা শুধু পরাগ সংগ্রহ করে। যখন লোম পড়ে যায় তখন এরা মৌচাক বা কলোনীর চাহিদা অনুযায়ী নেকটার, পানি বা প্রপলিস সংগ্রহ করে। মাঠ মৌমাছির আয়ুস্কাল নির্ভর করে কাজের পরিধি ও কঠিনতার উপর। মুখ্য মধু প্রবাহের সময় শ্রমিক মৌমাছি ৩০ দিন বাঁচে। তার মধ্যে ২০ দিন মৌচাকের বিভিন্ন কাজ করে এবং ১০ দিন পরাগ ও নেকটার সংগ্রহ করে। পুরুষ মৌমাছি রাণীর অনিষিক্ত ডিম হতে জন্ম নেয়। ঝাক বাঁধার সময় শুরু হওয়ার পুর্বে অল্প সময়ের জন্য কলোনীতে পুরুষ মৌমাছি লালন পালন করা হয়। রাণী মৌমাছি বড় কোষে পুরুষ মৌমাছি হওয়ার জন্য ডিম পাড়ে। ডিম হতে পূর্ণ বয়স্ক মৌমাছি হদে ২৪ দিন সময় লাগে।

রাণী বিহীন কলোনীতে রাণীর নির্যাসের অভাবে শ্রমিক মৌমাছির ডিম্বাশয় পূর্ণতা লাভ করে। তখন তারা অনিষিক্ত ডিম পাড়ে। তাদের ডিম হতেই পুরুষ মৌমাছি জন্ম গ্রহণ করে। পুরুষ মৌমাছির কাজ হল রাণী মৌমাছির সাথে মিলিত হওয়া। ৬ দিন বয়সে পুরুষ মৌমাছি উড়তে আরম্ভ করে। ১২ দিন বয়সে তারা পূর্ণতা লাভ করে। এক জায়গায় পুরুষ মৌমাছিরা একটা নির্দিষ্ট এলাকা পর্যন্ত উড়ে বেড়ায়। সে এলাকাকে পুরুষ মৌমাছির সমাবেশের জায়গা বলে। এ জায়গায় কুমারী রাণী মৌমাছি উড়ে বেড়ায়। সফলভাবে মিলনের জন্য অনেক পুরুষ মৌমাছি মারা যায়।

মধু প্রবাহের শেষ ভাগে মৌচাকে পুরুষ মৌমাছি লালন পালন বন্ধ হয়ে যায়। যারা থেকে যায় তাদেরকে শ্রমিক মৌমাছিরা মৌচাক থেকে বের করে দেয়। এক হাজার পুরুষ মৌমাছি তাদের আয়ুস্কালে খাদ্য হিসেবে ৭ কেজি মধু গ্রহণ করে থাকে।

Follow Us @VisitSundaebon